ইবিতে মাদকাসক্ত নবীনরাও!


admin প্রকাশের সময় : মে ৩০, ২০২২, ৬:২০ পূর্বাহ্ন /
ইবিতে মাদকাসক্ত নবীনরাও!

মাত্রারিক্ত নেশায় অজ্ঞান হওয়া ইবি শিক্ষার্থীর পরিবারের কাছে চিঠি

ইবি প্রতিনিধি ঃ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) সহজলভ্যতা ও সরবরাহ বাড়ার ফলে মাদকাসক্ত বাড়ছে। ক্যাম্পাসে আসার পরপরই মাদকে জড়াচ্ছেন নবীনরাও। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিরব ভূমিকাকে দায়ী করছেন সচেতন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, গণরুমে উঠিয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে মাদক ধরিয়ে দেন সিনিয়র শিক্ষার্থীরা। যাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্পাস পার্শ্ববর্তী স্থানীয়রা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানীয় কিছু কর্মচারী ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহ করে থাকেন। ভ্যান চালক, ঘাস কাটা, দর্শনার্থীসহ বিভিন্ন ছদ্মবেশে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন তারা। এছাড়াও কখনো ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক, লালন শাহ হল পকেট গেট, বঙ্গবন্ধু হল পকেটগেট, লেকসহ বিভিন্নভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। কখনো এসব গেটগুলোর পাশ্ববর্তী চায়ের দোকানে এজেন্টেরা ছদ্মবেশে থাকেন। মাদকাসক্ত এক শিক্ষার্থী জানান, পরিচিত কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছে এজেন্টদের মোবাইল নম্বর রয়েছে। এজেন্টরা তাদের কাছে মাদক সরবরাহ করে। অপরিচিত কোনো ব্যক্তির কাছে তারা সহজে মাদক বিক্রি করেন না। মাঝেমধ্যে এজেন্টরাও শিক্ষার্থীদের সাথে মাদকের আসরে বসেন।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীও মাদকের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদক ব্যবাসার সাথেও জড়িয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী ও কর্মচারী। গত চার বছরে মাদকসহ অন্তত ৩ জন কর্মচারী আটক হয়েছেন। সম্প্রতি গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এলাকায় আনোয়ার জোয়াদ্দার নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে ১৫০ পিস ইয়াবাসহ আটক হয়। এসব ইয়াবা তিনি ক্যাম্পাসে সরবরাহের উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছিলেন বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে মাদকের আসর বসলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। রাতে হলের কক্ষে, ছাদে, বঙ্গবন্ধু হল পুকুর পাড়, ক্রিকেট মাঠ, স্মৃতিসৌধ, টিএসসিসি, মফিজ লেকসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে বসে মাদকের আসর। ছাত্রহলগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু হল ও সাদ্দাম হোসেন হলে মাদকের আসর বেশি বসে। ক্যাম্পাসে আসার পরপরই গণরুমে উঠে নবীন শিক্ষার্থীরাও মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাদের এ ভয়াবহ নেশা ধরিয়ে দেন। মাদকাশক্তির কারণে পড়াশোনা থেকে দূরে থাকায় একাধিকবার ফেল করে বিভাগ থেকে বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে।
সূত্র জানিয়েছে, হাতের নাগালেই গাঁজা, মদ, ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হিরোইন প্যাথেডিনসহ বিভিন্ন ভয়বহ মাদক মিলছে। মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সাথে ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ, জুনিয়রদের র‌্যাগিং, শাসানো, হলের ডায়নিং বা দোকানগুলোতে ভয়-ভীতি দেখিয়ে ফাও খাওয়া, মারামারি, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপকর্মেও জড়িয়ে পড়ছেন।
এছাড়া সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য মাদকসক্ত জুনিয়রদের ব্যবহার করছেন। অতিরিক্ত মাদকসেবনের ফলে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন বেশ কিছু শিক্ষার্থী।
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, শুরুর দিকে বিভাগের এক জুনিয়রের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল। করোনার ছুটির পরে দেখি মাদকাসক্ত হয়ে প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন। অধিকাংশ সময়ই নেশায় বুদ হয়ে থাকে। তার বিভাগেরই এক সিনিয়দের হাত ধরে ছেলেটা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। মেধাবী মুখগুলো এভাবেই ধ্বংসের পথে।
প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে অভিযোগ সে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রক্টরিয়াল বডি কাজ করে যাচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরূদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে প্রশাসন।
তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পাসে মাদক ঢোকার বিষয় নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। তাদেরকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রভোস্টদের মাধ্যমে আবাসিক হলগুলোতে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে মাত্রারিক্ত নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে অজ্ঞান হয়ে পড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী আশিক কোরাইশির পরিবারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে মাদক সেবন থেকে বিরত থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে। এছাড়াও তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে প্রশাসন। আশিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত।
গতকাল রবিবার শিক্ষার্থীর মা তাহমিন চৌধুরীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। আশিক ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নাসির নগর উপজেলার জোকার্না গ্রামের মৃত সৈয়দ কায়েদুল হকের ছেলে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ২৫ মে আশিক কোরেশির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে মাদক সেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা ছাত্র শৃঙ্খলা আচারণের পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আপনার সন্তানের মাদক সেবন হতে বিরত থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে আশিক কোরেশির লিগ্যাল অভিভাবকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। আশিককে আমরা একটি কারণ দর্শানোর নোটিসও দিয়েছি। ক্যাম্পাসে মাদকের আকার দিন দিন ভয়ংকর হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে অভিযোগ পেলে আমরা আমাদের মত করে ব্যবস্থা নেব। প্রসঙ্গত, গত ২৫ মে রাতে বন্ধুদের সাথে মাত্রাতিরিক্ত মাদক গ্রহণের ফলে জ্ঞান হারান আশিক কোরেশি। এক ঘন্টা পার হলেও জ্ঞান না ফেরায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র নিয়ে যায় তার বন্ধুরা। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কুষ্টিয়ায় পাঠানো হয়।