ইসলাম দিয়েছে শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের অধিকার


১লা মে বিশ্ব শ্রমিক দিবস

॥ আলহাজ্ব আব্দুম মুনিব ॥

পহেলা “মে” বিশ্ব শ্রমিক দিবস। রাজপথে শ্রমিক অধিকারের দাবিতে বয়ে যায় মে দিবসের হাজারো মিছিল। কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না তাতে। মাসের পর মাস চলে যায় শ্রমিকরা বেতন পায় না। বেতনের দাবিতে শ্রমিককে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয়। শ্রমিকের বেতন-ভাতার ব্যাপারে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাদের প্রাপ্য মজুরি পরিশোধ কর। আর এভাবেই ইসলাম দিয়েছে শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের অধিকার।
মানুষ জীবন ধারণের জন্য যেসব কাজ করে, তাকে শ্রম বলে। মানুষ তার নিজের বেঁচে থাকার, পরিবারকে ভরণ-পোষণের, অপরের কল্যাণে এবং সৃষ্টি জীবির উপকারে যে কাজ করে, সেটাই শ্রম। ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নর-নারী নির্বিশেষে সব মানুষই কোনো না কোনো কাজ করে। আর যে কোনো কাজ করতে গেলেই প্রয়োজন হয় শ্রমের। সেই হিসেবে পৃথিবীর সব মানুষকেই শ্রমিক হিসেবে অভিহিত করা যায়।
আর অর্থনীতির পরিভাষায়, যারা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানায় কর্মকর্তার অধীনে শ্রমিক-কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন, তারাই শ্রমিক-শ্রমজীবী মানুষ। আর যারা শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ করেন, তাদের নিকট থেকে যথাযথভাবে কাজ আদায় করেন এবং শ্রমের বিনিময়ে মজুরি বা বেতন-ভাতা প্রদান করেন, তারাই মালিক।
মানুষের উন্নতির চাবিকাঠি হলো শ্রম। যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত। একজন দিনমজুরের শ্রম, কৃষকের শ্রম, শিক্ষকের শ্রম, অফিসারের শ্রম, ব্যবসায়ীর শ্রম। সবই সমান মর্যাদার অধিকারী। শ্রমের ব্যাপারে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, “অতঃপর যখন নামায শেষ হবে, তখন তোমরা জমিনের বুকে ছড়িয়ে পড় এবং রিযিক অন্বেষণ কর।” (সূরা: জুমা, আয়াত-১০)
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যাধিক। শ্রম দ্বারা অর্জিত খাদ্যকে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং জীবিকা অন্বেষণকে উত্তম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “ফরজ ইবাদতের পর হালাল রুজি অর্জন করা একটি ফরজ ইবাদত।” (বায়হাকী)। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) শ্রমকে ভালোবাসতেন। তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করেছেন, কাপড়ে তালি লাগিয়েছেন, মাঠে মেষ চরায়েছেন। নবীজী ব্যবসা পরিচালনাও করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে নিজ হাতে পরিখা খনন করেছেন। বাড়িতে আগত মুসাফির কর্তৃক বিছানায় পায়খানা করে রেখে যাওয়া কাপড় ধৌত করে মানবতা ও শ্রমের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কুরআন-হাদিস, ইসলামের ইতিহাস পড়লে জানা যায়, নবী-রাসূলগণ শ্রমিকদের কত মর্যাদা দিয়েছেন। নবী রাসুলগণ ছাগল চরিয়ে নিজে শ্রমিক হয়ে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
কোদাল চালাতে চালাতে একজন সাহাবীর হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাত দেখে বললেন, “তোমার হাতের মধ্যে কি কিছু লিখে রেখেছ ? সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) এগুলো কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য পাথুরে জমিতে কোদাল চালাতে গিয়ে হাতে এ কালো দাগগুলো পড়েছে। নবীজী (সা.) এ কথা শুনে ওই সাহাবীর হাতের মধ্যে আলতো করে গভীর মমতা ও মর্যাদার সাথে চুমু খেলেন। এভাবে অসংখ্য কর্ম ও ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বনবী (সা.) পৃথিবীতে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
ইসলামী র্আদশের কাছে মনিব-গোলাম, বড়-ছোট, আমীর-গরীবÑসবাই সমান। ইসলামী সমাজে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সমাজপতি, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদের আলাদাভাবে মর্যাদার একক অধিকারী হওয়ার সুযোগ নেই। একমাত্র ইসলামই শ্রমিকদের সর্বাধিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার কথা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে। পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম, অন্য কোনো মানব রচিত মতবাদ বা আদর্শ ইসলামের মতো শ্রমিকদের অধিকার দিতে পারে না।
রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের অধীন ব্যক্তিরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তায়ালা যে ভাইকে তোমার অধীন করে দিয়েছেন তাকে তা-ই খেতে দাও, যা তুমি নিজে খাও, তাকে তা-ই পরিধান করতে দাও, যা তুমি নিজে পরিধান কর।” (বুখারী, আবু হুরায়রা রাঃ)
ইসলাম শ্রমিকদের অধীকারের প্রতি সম্মান প্রর্দশন করে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেন আমার দাস, আমার দাসী, না বলে। কেননা আমরা সবাই আল্লাহর দাস-দাসী।”
মে দিবস মানে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটে অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজসহ বিভিন্ন দাবিতে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করে। বিক্ষোভ সমাবেশে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর গুলী চালায় পুলিশ। নিহত হন অনেক শ্রমিক। শ্রমজীবী মানুষের আপসহীন মনোভাব ও আত্মত্যাগের ফলে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
যাদের শ্রমে টিকে থাকে বা এগিয়ে যায় একটি সমাজ, তাদের প্রতি এ অবহেলা, অমর্যাদা কোনো মানবিকতাসম্পন্ন সমাজব্যবস্থা মেনে নিতে পারে না। পারে না বিশ্ব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো ইসলামী সমাজব্যবস্থাও। ইসলামে দৈহিক শ্রম ও দৈহিক শ্রমের মাধ্যমে যারা জীবিকা অর্জন করেন তাদের অতি উচ্চ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। হাদীসে বলা হয়েছে দৈহিক শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জনকারী আল্লাহর বন্ধু।
মহানবী (সা.) হজরত বেলালকে (রা.) ইসলামে প্রথম মোয়াজ্জিন এবং হজরত উসামা বিন যায়েদকে (রা.) ইসলামে প্রথম যুব সেনাপতি নিযুক্ত করে দাস-শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন করেন। তার কোনো উম্মত কর্তৃক যেন কোনো শ্রমককে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য মহানবী (সা.) কঠোর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন এভাবে, ‘আল্লাহ বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির সঙ্গে আমার ঝগড়া হবে।
১. যে আমার নামে চুক্তি করে তা ভঙ্গ করে। ২. যে স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করে। ৩. যে শ্রমিকের দ্বারা কাজ পুরোপুরি আদায় করে নেয় অথচ তার পুরোপুরি পারিশ্রমিক আদায় করেনি।’ (বোখারি) তাই বলবো- ইসলাম শ্রমজীবীদের সব সমস্যার সার্বিক ও ন্যায়ানুগ সমাধানের যে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে তা সংশ্লিষ্ট সবাই নিষ্ঠার সঙ্গে পালনে এগিয়ে এলেই তারা বেঁচে থাকতে পারে। তাদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার মন মানসিকতা আল্লাহর কাছে মে দিবসের কামনা হওয়া উচিত।
লেখক- কামিল (আল হাদিস) মাস্টার্স (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *