এক পুলিশের গল্প(তৃতীয় পর্ব )




বাবা সাবেক ব্রিটিশ ভারতের সময়ে ১৯৪০ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন৷ আমার পূর্বপুরুষ স্বাধীনতা-পূর্ব সময় ভারতের কলকাতা শহরের ধুকুরিয়া লেনে বসবাস করতেন৷ আমার প্র-পিতামহের বড় ব্যবসা ছিলো৷ ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হওয়া কিছু আগে আমার পিতামহ এদেশে চলে আসেন এবং চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানাসহ চরপাড়া গ্রামের নিজ স্থায়ী আবাসভূমিতে বসবাস করা শুরু করেন৷ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাবা আমাদের মাগুরা জেলার গোয়ালখালি গ্রামে রেখে চলে আসেন৷ আমার বয়স তখন এগারো বৎসর ছুই ছুই করছে৷ দেশ স্বাধীন হলে বাবা পুলিশের উপ-সহকারী পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন৷ পরবর্তীতে সহকারী পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পেলে যশোর জেলার লোহাগড়া থানায় বাবার পোস্টিং হয়৷ তিনি আমাদের লোহাগড়ায় নিয়ে আসেন৷ লোহাগড়া থানার লক্ষীপাশা গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় সামাদ সাহেবের ভাড়াটিয়া বাসায় আমরা বাবা আমাদের-সহ থাকতে শুরু করেন৷ সেখান থেকেই আমি আমার মাধ্যমিকের স্কুল লক্ষীপাশা আদর্শ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করি৷ পরবর্তীতে লোহাগাড়া আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে আমি উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হই৷ বাবা চিরকালই নিরীহ গোছের ছাপোষা মানুষ ছিলেন৷ এ কারণে তিনি সাদা পোশাকের ডিএসবি চাকরিকে বেছে নিয়েছিলেন৷ কোন ঝামেলা তিনি পছন্দ করতেন না, তাই নির্ভেজাল জীবন যাপন করাই বাবার পছন্দ ছিলো৷ বাবাকে আশেপাশের সবাই পছন্দ করেন৷ বাবার স্বল্প আয়ের সংসারে বাবা কোনোভাবে আমাদের দুই ভাই দুই বোনকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন৷ আমরা সব ভাইবোন স্কুল কলেজে লেখাপড়া করি৷ আমাদের জীবনে বিলাসিতা বলে কোনো শব্দ নেই৷ লক্ষীপাশা পশ্চিম পাড়ায় পুলিশের উপ-পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ বদরুদ্দীন আহমদের ছেলে মুকুল আমার ক্লাসমেট এবং বেস্ট ফ্রেন্ড৷ স্কুল-কলেজের সময়ের ফাঁকে দু বন্ধু একত্রে অনেক সময় কাটায়৷ লক্ষীপাশা জায়গাটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বেষ্টিত এখানকার অধিকাংশ মানুষ সাংস্কৃতিক মনা৷ স্থানীয় ‘বলাকা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে আমি নাম লিখিয়েছি৷ এই সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী থেকে আমরা প্রতি মাসে একটা করে নাটক মঞ্চস্থ করি৷ লক্ষ্মীপাশা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার অলক রঞ্জন পাঠক আমাদের অভিনয় গুরু৷ অভিনেতা হিসেবে আমার চারিপাশে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে৷৷ নাটক করি বলে যে একদম বখে গিয়েছি তেমনটি নয়, কারণ লোহাগড়া আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে আমি কলা বিভাগের সেরা ছাত্র৷ এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় আমি সেরা ফলাফল নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি৷ আমার কলেজ জীবনের এই পড়াশোনার ফাঁকে আমার লক্ষীপাশার বাসার প্রতিবেশীর আত্মীয় মহুয়া নামের এক ললনার সাথে আমার ভালোবাসা হলেও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং আমার বেকারত্বের কারণে সে ভালোবাসার ফুল প্রস্ফুটিত হবার আগেই ঝরে গেছে৷ সেটা আমার জীবনের জন্য এক বড় আফসোসের বিষয়৷ চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানা স্বনির্ভর থানা হিসেবে ঘোষণা করায় বাবা আলমডাঙ্গাবাসী হিসেবে বাবার আলমডাঙ্গা থানায় সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে পোশাকে বদলি হয়েছে, যদিও বাবা পুলিশের পোশাকের চাকরিতে অভ্যস্ত নন৷ কর্তার ইচ্ছেই কর্ম তাই বাবাকে সেখানে যেতেই হবে৷ বাবার যাওয়া মানে আমাদের যাওয়া তাই লক্ষীপাশার সুদীর্ঘ সাত বছর সময়ের স্মৃতিকে পিছনে ফেলে নতুন যাত্রা পথে যাত্রা করতে হবে৷ লক্ষীপাশার মাটিতে আমার অনেক স্মৃতি বিজড়িত৷ পড়াশোনা, সংস্কৃতি, মানবতা মনুষত্ব সবকিছু শিক্ষা আমার লক্ষীপাশার এই মাটি থেকে পাওয়া৷ বদলি সূত্রে যাবার জন্য বাবা-মা সংসারের সব কিছু গোছগাছ করে ফেলেছেন৷ আজ লক্ষীপাশা থেকে আমাদের আলমডাঙ্গার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে হবে৷ আমাদের নিতে ট্রাক এসে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে৷ ট্রাকে মালামাল উঠিয়ে দেখতে পেলাম চারিদিকে অনেক মানুষের ভিড়৷ সবাই আমাদের বিদায় জানাতে এসেছেন৷ অনেককেই রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে দেখলাম৷ বন্ধু মুকুল আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না৷ বিদায় বেলা আমার দেবার কিছুই নেই৷ শুধু কবির ভাষায় বলতে পারি ‘শূন্য আমি রিক্ত আমি দেবার কিছুই নাই, আছে শুধু ভালোবাসা গ্রহণ করো তাই৷” আমাদের ট্রাক আস্তে আস্তে তার যাত্রা পথে চলা শুরু করলো৷ একটু দূরে যেতেই পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সবাই এদিকে তাকিয়ে আছে৷ আর আমার বন্ধু মুকুল এমনভাবে তাকিয়ে আছে দেখে মনে হল যেন পৃথিবী থেকে তার সবকিছুই হারিয়ে গেছে৷ সে যেন কেঁদে কেঁদে বলছে ‘তারপর এই শূন্য জীবনে কত কাটিয়াছি পাড়ি, যাহারে যেখানে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি৷

(লেখক,অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *