এক পুলিশের গল্প (অষ্টম কিস্তি)



(লেখক,মোঃ শহিদুল্লাহ,অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা)

কুষ্টিয়া ফিরে আসার এক সপ্তাহের মাথায় খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে আমার চূড়ান্ত নির্বাচনী ভাইভায় অংশ নেয়ার চিঠি হাতে পেলাম৷ তিনদিন পর ভাইভা তাই ডাইরেক্ট সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগপ্রাপ্তির চূড়ান্ত পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার একবুক আশা নিয়ে নির্বাচনী পরীক্ষার পড়াশোনার দিকে আবার মনঃসংযোগ সিরিয়ে আনলাম৷ বাবা আমাকে ট্রেন স্টেশন-এ এসে সকালের ট্রেনে তুলে দিলেন৷ ট্রেনে তুলে দেওয়ার আগে বাবা ছলছল চোখে বললেন ‘আমি কোনদিন কারো ক্ষতি করিনি, কোন অন্যায় করিনি; আমি জানি আল্লাহ পাক আমার ডাক অবশ্যই শুনবেন৷ তুমি অবশ্যই সম্মাননীয় ডিআইজি জনাব এম এম শরীফ আলী মহোদয়ের সামনে নির্বাচনী ভাইভায় ভালো ফলাফল করবে৷ আমি বাবাকে সালাম দিয়ে ট্রেনে আমার নির্দিষ্ট সিটে বসে পড়লাম৷ আস্তে আস্তে ট্রেন চলতে থাকলো৷ বাবা আমার দিকে যতক্ষণ চোখ যায় একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন৷ এক সময় আলমডাঙ্গা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আমার চোখ থেকে আস্তে আস্তে দূরে দূরে মিলিয়ে যেতে থাকলো৷ ট্রেন বিকেল নাগাদ দৌলতপুর রেল স্টেশনে তার ঠিকানা খুঁজে পেল৷ ট্রেন থেকে আমি নেমে দেখি আমার লক্ষীপাশা ছাত্র জীবনের বন্ধু খুলনা পলিটেকনিকের ছাত্র আতাউর আমাকে নেওয়ার জন্য রেলওয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করছে৷ সে অনেকদিন পর আমাকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরল৷ এ যেন এমন কোন প্রেমিক দীর্ঘদিন পর যেন তার মানসী প্রিয়াকে খুঁজে পেয়ে আবেগ সামলাতে না পেরে জড়িয়ে ধরেছে৷ আমিও অনেকদিন পর পুরোনো বন্ধুকে  পেয়ে আবেগাপ্লুত হলাম৷ এতদিনের বন্ধুকে না-দেখার আবেগ সামলিয়ে আমরা দৌলতপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করে সামনের রাস্তায় এসে পৌছালাম৷ একটা রিকশা ডেকে দুজনে সেই রিকশায়  উঠে আতাউরের পলিটেকনিক কলেজ হোস্টেলে উদ্দেশ্যে রওনা হলাম৷ ঘন্টাখানেক পর দৌলতপুরের বয়রায় আতাউরের পলিটেকনিক কলেজ হোস্টেলে এসে  পৌছালাম৷ আতাউর তার রুমের এক কোনায় নিরিবিলি পরিবেশে আমাকে থাকার এবং রাত জেগে পড়ার জন্য জায়গা করে দিলো৷ আমি বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন থাকার ভালো জায়গা পেয়ে খুব খুশি হলাম৷ রাত জেগে পড়াশোনা করলাম৷ সামনে আমার পরীক্ষার অথৈ সাগর, সে সাগর সাঁতরে পার হতে হবে৷ জানিনা পার হতে পারব কি-না? তবুও আমার মনের বিশ্বাস পরম করুণাময় আমাকে কখনো বৈমুখ করেননি, আর তাই হয়তো এ যাত্রায় আমি আমার নিজের যোগ্যতায আর পরম করুণাময়ের অসীম মেহেরবানীতে পার হয়ে যেতে পারব৷ সকাল ন’টা নাগাদ দুরুদুরু বুকে রেঞ্জ ডিআইজি মহোদয়ের অফিসে এসে উপস্থিত হলাম৷ স্টাফ অফিসার মহোদয়ের কাছে আমাদের কাগজপত্র জমা দিলাম৷ নির্বাচনী বোর্ডের সভাপতি সম্মাননীয় রেঞ্জ ডিআইজি খুলনা জনাব এম এম শরীফ আলী ইতোমধ্যে তার অফিসে এসে গেছেন, বোর্ডের অন্যান্য সদস্যরা একে একে আসছেন৷ আমি এবং আলী নাসিম মোঃ খলিলুজ্জামান  কুষ্টিয়া জেলা থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছী৷ আমাদের সাথে ওয়েটিং লিস্টের কয়েকজন এসেছেন যদি আমরা কেউ ভাইভা বোর্ডে অকৃতকার্য ওই তাহলে হয়তো কারো ভাগ্যে সিকে ছিড়লেও ছিড়তে পারে৷ঠিক সকাল দশটায় ভাইভা শুরু হলো৷ কুষ্টিয়া বটতলীনিবাসী  সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগপ্রার্থী সৈয়দ আলী নাসিম মোঃ খলিলুজ্জামানের ডাক প্রথম এলো৷ নাসিম ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করলে আমরা বাইরে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষায় রইলাম৷ আধাঘন্টা পর নাসিম বেরিয়ে এলো৷ একসাথে পরীক্ষা দিতে গেলেও কেউ কাউকে চিনি না, কারো সাথে তেমন কোন কথাবার্তা হয়নি৷ আমি নাসিমের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনের কথা পড়ার চেষ্টা করলাম৷ কিন্তু ভালো-মন্দ কিছুই বুঝতে পারলাম না৷ এরপর আমার পালা এলো৷ ভিতর থেকে ডাক পড়লো ‘মোঃ শহিদুল্লাহ হাজির’৷ মহান আল্লাহ পাকের নাম স্মরণ করে ভাইভা বোর্ডের মধ্যে প্রবেশ করলাম৷ প্রবেশ করেই মুখ থেকে উচ্চারণ করলাম ‘আসসালামু আলাইকুম’ সাথে সাথে উত্তর  এলো ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম৷’ সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন৷  বোর্ড সভাপতি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন “আপনার রেজাল্ট দেখলাম খুব ভালো৷ আপনি অন্য কোন ভাল জব নিতে পারতেন, কিন্তু তা না করে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর এর এই জব  কেন পছন্দ করতে চাইছেন?” তখন আমি উত্তর দিলাম “বাংলাদেশে পুলিশের চাকরিই একমাত্র চাকরি যে চাকরিতে মানুষের সেবা করা যায়৷ একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন সে আল্লাহর পরে  বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য পুলিশকে স্মরণ করে৷ এ কারণে পুলিশের চাকরি অত্যন্ত পুতঃপবিত্র চাকরি৷ এ চাকরি ঠিকমতো করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি সহ পরকালের বেহেস্তের দরজা পাওয়ার পথ প্রসস্ত হয়৷ সবাই একযোগে প্রতিউত্তর করলেন ‘ব্রাভো-ওয়েল সেইড’ এরপর ডিআইজি মহোদয় আমাকে আবার প্রশ্ন করলেন “একটি বিশেষ সেতু কুষ্টিয়া এবং পাবনা জেলাকে সংযুক্ত করেছে৷ সেতুটার কি নাম এবং পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার কোন জায়গা  এই রেলওয়ে সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে ৷আমি সাথে সাথে উত্তর দিলাম ‘এটা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ৷ পাবনা জেলার পাকশী এবং কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারাকে এই সেতুটি সংযুক্ত করেছে৷ এরপর আরো কিছু প্রশ্ন করা হলো আমি সব প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দৃপ্ত ভঙ্গিতে দিলাম৷ সভাপতি মহোদয় বললেন “আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন, পরে ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে৷” সবার ভাইভা নেওয়া শেষে আমাকে এবং আলী নাসিম মোঃ খলিল উজ্জামান কে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়েছে মর্মে জানিয়ে দেওয়া হলো৷ আরও বলা হলো এই সংক্রান্তের চিঠি সঠিক সময়ে আমাদের বাড়ির ঠিকানায় পৌঁছে যাবে৷ আমাদের এক বছরের জন্য পুলিশ একাডেমী সারদা মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে বলেও অামাদের জানানো হলো৷ আমি খুশির খবর নিয়ে আতাউরের কলেজ হোস্টেলে পৌঁছালে সেখানে যেন আনন্দের জাহ্নবী ধারা বয়ে গেল৷ আতাউর নিজ খরচে দার রুমমেটদের আমার কৃতকার্যতা উপলক্ষে রাতের মিল উপহার দিল৷ সবাই মিলে পাশের নেভাল সিনেমা হলে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ‘সাগরিকা’ সাদাকালো ছবিটি উপভোগ করলাম৷ সকালে নাস্তা শেষে খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছলাম৷ সেখানে আলমডাঙ্গা যাবার ট্রেনের টিকিট কেটে পকেটে রেখে দিলাম৷ ট্রেন সৈয়দপুর যাওয়ার জন্য স্টেশনে প্লাটফর্মে যাত্রীর অপেক্ষায় আছে৷ আমি ট্রেনে নিজের আসনে বসার আগে আতাউর আমাকে আর(চলবে)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *