এক পুলিশের গল্প (চতুর্থ পর্ব)


(লেখক,মোঃ শহিদুল্লাহ, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা)

বাবা আলমডাঙ্গা থানার থার্ড অফিসার হিসেবে যোগদান করলেন৷ থানায় থার্ড অফিসারের কোন কোয়ার্টার না থাকায় স্থানীয় আলমডাঙ্গা শহরের জব্বার মাস্টারের বাসা মাসিক ৪০ টাকা রেন্ট এ ভাড়া নিলেন৷ আমি এদিকে খুলনার দৌলতপুর বি এল কলেজে ইংরেজিতে অনার্স বিষয়ে ভর্তি হয়েছি৷ দৌলতপুরের বৈকালী সিনেমা হল-এর নিকটবর্তী সিএসডি স্টাফ কোর্য়াটারে আমার খালু স্বপরিবারে বসবাস করেন৷ সেখানেই আমার ঠিকানা হলো৷ সকালে নাস্তা করে পায়ে হেঁটে বৈকালী সিনেমা হল মোড়ে যেয়ে সেখান থেকে টাউন সার্ভিস বাসে করে বিএল কলেজের সামনের রাস্তায় নেমে পায়ে হেঁটে ক্লাসে পৌছায়৷ জিল্লুর ফরিদা আমার ক্লাসমেট৷ এভাবে আমি নিয়মিতভাবে কলেজ খোলার দিন কলেজে এসে ক্লাস করি৷ খালার ওখানে থাকি তাই খালার সংসারের বাজার রেশন ইতালি মাঝে মাঝে এনে দিতে হয়৷ খালার ছেলে মেয়েদের ক্লাসের পড়া দেখিয়ে দিতে হয়৷ এতে করে আমার ক্লাসের যে পড়া তা তৈরি করতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়৷ তাই সিদ্ধান্ত নিলাম খালার বাসাই নয় বাইরে কোথাও থেকে কলেজে ক্লাস করব৷ বন্ধু বাদলের মাধ্যমে রায়েরমহল গ্রামে ইসমাইল সাহেবের ওখানে আমি আস্তানা খুজে পেয়েছি৷ কিন্তু এখানে আমার ইসমাইল সাহেবের দুজন ছেলেকে পড়াতে হয়৷ সবচেয়ে অসুবিধা হলো ইসমাইল সাহেবের অতিরিক্ত কোন ঘর না থাকায় তিনি আমাকে তার ঘরের বারান্দায় একটা খাটের উপর থাকার জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন৷ রাতে সবাই যখন ঘুমাতে চলে যায় তখন আমি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি৷ শুনশান নিরবতা আমাকে ঘিরে ধরে৷ শুধু রাতে জ্বলা জোনাকিরা দূরে থেকে আমাকে সংগ দেয়৷ এক কথায় আমি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি৷ একদিন রাতে কয়েকজন চোর টর্চ জ্বালিয়ে ইসমাইল সাহেবের ঘরের উঠোনে এসে পড়লে আমি কে কে বলে ডাক চিৎকার দিলে সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ে টর্চলাইধারীরা পালিয়ে যায়৷ পরে শুনতে পেলাম তারা সঙ্গবদ্ধ গরুচোর দল ছিলো৷ আমার মনের মধ্যে ভয় আরো পাকাপোক্ত হলো৷ সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে থাকবো না, অন্য কোথাও চলে যাব৷ এরপর পাবলা গ্রামে একজন সাব-ইন্সপেক্টর এর বাসায় তার সহযোগিতায় আমার নতুন ঠিকানা খুঁজে পেলাম৷ সেখান থেকেই কলেজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি৷ খাওয়া খরচ হিসেবে এসআই সাহেবের শ্যালক আজিজকে মাসিক খরচের টাকা এবং থাকা বাবদ ১০০ টাকা করে দিয়ে যাচ্ছি৷ ইতোমধ্যে বিএল কলেজ-এ আমি যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে বৃত্তি পেলাম৷ বইকেনা সহ বোর্ড কর্তৃপক্ষ এককালীন ৫০০০ টাকা আমাকে দিয়েছে৷ আমি কয়েকদিনের ছুটিতে আলমডাঙ্গায় চলে এসেছি৷ ছুটিকালীন আমি প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হলাম৷ সেই সময় আমাকে ইংরেজি বিভাগে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য বিশেষ একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু আমি জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারলাম না৷ জ্বর থেকে সুস্থ হয়ে আমি কলেজে ফিরে জানতে পারলাম ইংরেজি বিভাগ কর্তৃপক্ষ আমাকে আমার ইংরেজি অনার্স বিষয়ে পড়াশোনা করার অধিকার কেড়ে নিয়েছে, কারণ আমি পরীক্ষা দেইনি৷ আমি বিভাগীয় প্রধানের সামনে পুটআপ হয়ে বললাম’ স্যার আমি প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় কলেজে এসে পরীক্ষা দিতে পারিনি, নতুন করে আমার পরীক্ষা নেন৷বিভাগীয় প্রধান উত্তর দিলেন ‘তোমাকে ডিজকোয়ালিফাইড করা হয়েছে, সুতরাং ইংরেজিতে তুমি আর অনার্স পড়তে পারবে না৷ তুমি এই কলেজের অন্য সাবজেক্ট পছন্দ করে সে বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য নতুন করে ভর্তি হয়ে যাও৷ আমার ন্যায্য দাবি না শোনায় মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে পড়াশোনায় এমনি নানা প্রতিকূলতা, তারপর আমার পছন্দনীয় সাবজেক্ট যেটা আমি আমার মেধার বিনিময়ে পরীক্ষা নামের বৈতরণী পার হয়ে অর্জন করেছিলাম যদি সেখানেই পড়তে না পারি তবে এ কলেজে আমি আর পড়ব না৷ বাসায় থেকেই আমি পাস কোর্স-এ ভর্তি হব৷ বাড়িতে থেকে পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ পাব৷ আমি বিশ্বাস করি এতদিন যে সমস্ত পরীক্ষা দিয়ে এসেছি সে সব পরীক্ষায় আমি টপার ছিলাম৷ আলমডাঙ্গা কলেজেও আমি ভালো করবো৷ আমি বিএল কলেজ থেকে টিসি নিলাম৷ আলমডাঙ্গা কলেজে আমার যশোর বোর্ডের বৃত্তির কাগজপত্র ট্রান্সফার করিয়ে নিলাম৷ সকালে খুলনা পার্বতীপুর রকেট মেইল ধরে আলমডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম৷ দুপুর তিনটায় আলমডাঙ্গা পৌঁছে গেলাম৷ রিক্সা যোগে বাসায় ফিরে আসতেই বাবা আমাকে দেখে অবাক হলেন বললেন ‘বাবা তুমি অসময়ে? তোমার তো এখন আসার কথা নয়৷ আমি বাবাকে বললাম ‘বাবা আমি জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম তাই কলেজের পরীক্ষা দিতে পারিনি৷ এ কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে ডিজকোয়ালিফাইড করেছে৷ তাদের আসল ঘটনা খুলে বললেও তারা আমার বিষয়টা আমলে নেননি, তাই আমি টিসি নিয়ে চলে এসেছি আলমডাঙ্গা কলেজে ডিগ্রী পাশ কোর্সে ভর্তি হব৷’ বাবা বললেন তোমার মত মানিককে যারা চেনেন নি তাদের দূরদর্শীতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে৷ সমস্যা নেই তুমি ভালো ছাত্র৷ তুমি যেখানেই ভর্তি হবে সেখানেই তোমার প্রতিভার ঝলকে চারদিক উদ্ভাসিত হবে৷ তুমি আলমডাঙ্গা কলেজেই ভর্তি হও৷ আমার দোয়া সব সময় তোমার সাথে আছে থাকবে৷(চলবে)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *