এক পুলিশের গল্প (নবম পর্ব)


(লেখক,মোঃ শহিদুল্লাহ,অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা)

ঝিকঝিক শব্দে আমার ট্রেন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে৷ আমি ট্রেনের জানালা দিয়ে রেললাইনের দুপাশের আদিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে আছি, মনে মনে ভাবছি এতদিনে হয়তো আমার বাবার দুশ্চিন্তার দিনের অবসান হতে চলেছে৷ আমি ডাইরেক্ট সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে মনোনীত হয়েছি; বাবার সাথে সাথে আমিও সংসারের হাল ধরতে পারবো৷ বিকেল তিনটে নাগাদ আমাকে বহনকারী ট্রেন আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এর সান্নিদ্ধ্যে নিজেকে খুঁজে পেল৷ আমি ট্রেন থেকে নেমে রিক্সা যোগে বাসার দিকে এগিয়ে চললাম৷ ফেরার পথে মধুর মিষ্টির দোকান থেকে কয়েক কেজি মিষ্টি কিনে নিলাম৷ বাসায় পৌঁছে দেখলাম মা রান্না ঘরে পাক-শাকের কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলেছেন৷ ছোট বোন জলি ও পলি স্কুলে গেছে৷ আমাকে দেখে মা এগিয়ে এলেন, কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে চোখে ফোটা ফোটা অশ্রু মাটিতে ফেললেন৷ মনে হলো কতদিন যেন মা আমায় দেখেননি৷ বাবা তখন অফিসে ছিলেন৷ আমি বাসায় ঢুকে কাপড়চোপড় ছেড়ে গোসল সেরে ফ্রেস হয়ে নিলাম৷ মা দুপুরের খাবার দিলেন, আমি খেয়ে বিশ্রামে চলে গেলাম৷ বিকালে বাবা ফিরে আসলে বাবাকে আমার সফলতার গল্প শোনালাম৷ বাবা খুশিতে উদ্বেলিত হলেন বললেন ”বাবা আমি এতদিন সংসারের ঘানি টেনে টেনে ক্লান্ত শ্রান্ত, চাকরির সময় আর বেশিদিন নেই; তাই অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম৷ এখন কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তার উপশম হলো৷ এক বছর পুলিশ একাডেমি সারদার কঠিন প্রশিক্ষণ শেষ করে আসতে পারলেই সব ঝামেলার অবসান ঘটবে৷” বিকালে প্রতিবেশীরা আমার আসার খবর পেয়ে সবাই একে একে আমাকে দেখতে আসলেন৷ তাদের সবার গর্ব আমি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর এর চাকরি পেয়েছি৷ বাসায় আসা মেহমানদের মা চা আর মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন৷ সবাই বলতে লাগলেন শহিদুল্লাহ আমাদের গর্ব৷ দেশ প্রেমিক বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সে চাকরি পেয়েছে৷ তবে তার যে মেধা সে বিসিএস করে সহকারী পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ নিতে পারত৷ বাবা বললেন ”আমার প্রয়োজনেই বাপ আমার এই চাকরি খুঁজে নিয়েছে৷ যা পেয়েছে সেটাই ভালো৷ এই চাকরিতে সে ভালো করবে, আপনারা সবাই দোয়া করেন৷” সবাই প্রাণভরে আমাকে দোয়া করলেন৷ সাত দিন পরেই আমাকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি সারদায় এক বছর মেয়াদী মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য যেতে হবে৷ ডিআইজি অফিস থেকে আগত চিঠিতে পিটি প্যারেড-এর পোশাক বানানোর কথা বলা আছে৷ বিকেলে আমি আলমডাঙ্গা টকিজ সিনেমা হলের আমার ক্লাসমেট জালালকে সাথে করে আলমডাঙ্গা বাজারে গেলাম৷ সেখানে হাফ প্যান্ট এবং হাফ শার্ট বানানোর জন্য দর্জিকে অর্ডার দিলাম৷ বাজার থেকে একজোড়া সাদা কেডস এবং সাদা মোজা কিনে ফেললাম৷ খাকি পোশাক পুলিশ একাডেমিতে যেয়েই বানাবো সিদ্ধান্ত নিয়ে বাসায় ফিরলাম৷ মা সারদায় যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে আস্তে আস্তে আমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলেছেন৷
আজ আমার পুলিশ একাডেমি সারদায় যাবার দিন৷ সকালে বড় ভাই শামসুল হক যশোর থেকে আলমডাঙ্গায় এসেছেন আমাকে সারদার উদ্দেশ্যে সি অফ করার জন্য৷ বাসায় ভাই বোনদের চোখ জল ছলছল, কারণ তাদের আমাকে এক বছরের জন্য চোখের আড়াল করতে হবে৷ তারা শুনেছে সারদার ট্রেনিং খুব কঠিন ট্রেনিং, সেখানে ট্রেনিং করতে যেয়ে অনেকের হাত-পা ভেঙে যায়; ঘোড়া থেকে পড়ে অনেকে অচল হয়ে যায় ইত্যাদি৷ জীবনে আমাকে কোনো চরম পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়নি৷ পুলিশ একাডেমিতে গিয়ে আমি প্রশিক্ষণের মত কঠিন কাজ শেষ করতে পারবো কি-না সে বিষয়ে সবাই চিন্তিত৷ মায়ের কথা অার কি বলব, যেদিন থেকে শুনেছেন আমাকে সারদায় যেতে হবে সেদিন থেকে তিনি তার চোখ থেকে যে পানি ঝরাচ্ছেন ধরে রাখলে হয়তো তা পদ্মা মেঘনা যমুনা নদীর জলের ধারার অংশীদার হতে পারত৷ আজ সকাল থেকেই আমি যা যা খেতে ভালবাসি মা একে একে সে সব বানালেন আমাকে খাওয়ানোর জন্য৷ দুপুরের খাওয়ায় তার কিছু আমি গলাধঃকরণ করলেও সবকিছু খেতে পারলাম না, কারণ বাড়ি ছেড়ে এক বছরের জন্য সারদায় সবাইকে ছেড়ে যেতে আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে৷ কিন্তু কিছু করার নেই যে, যেতে আমাকে হবেই; এটাই অামার ভবিতব্যে নির্ধারিত৷ আমার লাগেজ সব গুছানো হয়েছে, একটু পরেই রিকশা বাসার সামনে এসে থামবে আমাকে রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য৷ আমার সাথে সেজো ভাই অলি পুলিশ একাডেমি পর্যন্ত যাবে, আর বড় ভাই যাবেন রেলওয়ে স্টেশনে সি-অফ করার জন্য৷ যাওয়ার আগে মা অাবার খাসির মাংস দিয়ে ভাত বাড়লেন, মাখিয়ে মাখিয়ে আমাকে খাওয়ালেন৷ অর্ধেক খাওয়া হলো বাকি অর্ধেক পাতেই পড়ে রইল৷ বাবা-মা কে সালাম জানিয়ে বোন দের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিক্সায় উঠে বসলাম৷ আমাকে নিয়ে রিক্সা আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হলো৷ সামনের রিকশাই বড় ভাই আর সেজো ভাই, আমার রিকশায় লাগেজ নিয়ে আমি৷ একটু বাদেই রিক্সা বাংলাদেশের একমাত্র দোতলা রেলওয়ে স্টেশন আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌছাল৷ লাগেজ সহ প্লাটফর্মে উঠে এলাম৷ বড় ভাই পুলিশ একাডেমি পর্যন্ত টিকিট কেটে দিলেন৷ একটু পরেই ট্রেন, আমরা ট্রেনের অপেক্ষায় রইলাম৷ একটু পরেই ট্রেন এসে পৌঁছালে আমি আর সেজো ট্রেনে উঠে বসলাম আমাদের নির্ধারিত আসনে৷ বড় ভাই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন৷ একটু পর ট্রেন যাত্রা পথে রওনা হলো৷ ট্রেনের জানালা দিয়ে আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এর দিকে তাকিয়ে রইলাম৷ যতক্ষণ চোখ যায় তাকিয়ে থাকলাম, এক সময় স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো৷ মনোবীণা গিয়ে উঠলো ‘মুসাফির মোছরে আঁখি জল ফিরে চল আপনারে নিয়া৷’


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *