এক পুলিশের গল্প (শেষ কিস্তি)


(লেখক,মোঃ শহিদুল্লাহ,অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা)


আমার পুলিশ জীবন যেন রবীন্দ্রনাথের সেই ছোটগল্পের সংজ্ঞা এর মত

‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা,
ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্ত সহজ সরল,
সহস্র
বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ
যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারটি অশ্রু জল।
নাহি বর্ণনার
ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব
নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ
করি মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।’
পুলিশ একাডেমি সারদায় ৮৭ জন ব্যাচমেট বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণে অনেক ঘাম ঝরিয়েছি৷ প্রশিক্ষণে দক্ষ হওয়ার জন্য পিটি, প্যারেড, হর্স রাইডিং, অবস্টিকাল অতিক্রম, আইনের পাঠ রপ্ত করেছি এক ভোর থেকে আর এক ভোর পর্যন্ত৷ তারপর বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ সফলতার সাথে শেষ করে এস আই হিসেবে বাস্তব প্রশিক্ষণ নিয়েছি বরিশাল জেলার কোতোয়ালি থানায়, সদর সার্কেল অফিসে, ঝালকাঠি পুলিশ কোর্টে এবং বরিশালের গৌরনদী থানায়৷ এখানেও অনেক চড়াই উতরাই পার হতে হয়েছে একজন দক্ষ সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য৷ তারপর সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে স্থায়ী হয়ে পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর থানা সেকেন্ড অফিসার হিসেবে পদায়ন হয়েছি৷ নদীমাতৃক নাজিরপুর থানায় নৌপথে নৌকা যোগে পুলিশী বিউটি করতে যেয়ে অনেক লোমহর্ষক ঘটনা আর রোমাঞ্চের দেখা পেয়েছি৷ এরপর পিরোজপুর-এর ইন্দুরকানী থানায় একই পরিবারের ১০ জন সদস্যকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বলে গ্রেপ্তার করে আমার ঘটনা মনে আজও দাগ কেটে আছে৷ এরপর ঢাকা বিশেষ শাখায় কিছুদিন, তারপর সাতক্ষীরা সদর থানা, কালিগঞ্জ থানা, ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর থানা ও কোটচাঁদপুর কোর্ট এবং সব শেষে কালিয়া কোর্টে কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ করার পর পুলিশ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেয়ে নড়াইল জেলায় ডিআই ও-১ হিসেবে কাজ করেছি৷ এক পর্যায়ে নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে পরিচিত মানুষদের চরিত্রের যে বহিঃপ্রকাশ দেখেছি তা এই পুলিশের চাকরিতে না আসলে হয়তো জানা হতোনা৷ এরপর বরিশাল জেলার গৌরনদী থানা আর মাগুরা জেলার শালিখা থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী দলের বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করেছি; কেন তারা এ দলে এসেছে এবং কেমন তাদের জীবনের রোজনামচা ছিল তার ইতিহাস আমার অভিজ্ঞতার খাতায় সঞ্চয় করে রেখেছি৷ উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে কেমন করে সুবিধাবাদীরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগে সে অভিজ্ঞতাও আমার এই চাকরি জীবনে আমি পেয়েছি৷ আমার চাকরি জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণময় সময় ছিল সিরাজগঞ্জ পুলিশ কোর্টের পরিদর্শকের দায়িত্ব পালনের দিনগুলি৷ এখানে আমি আমার পেশাদারিত্বের শতভাগ উজাড় করে পরপর ১৩ বার রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি কর্তৃক শ্রেষ্ঠ পরিদর্শকের মুকুট অর্জন করেছি৷ একাজে আমাকে সব সময় গাইড করেছেন সিরাজগঞ্জের সুযোগ্য পুলিশ সুপার জনাব এস এম ইমরান হোসেন এবং জনাব মিরাজ উদ্দিন আহমেদ (পিপিএম)৷সহকারী পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়ে কুষ্টিয়া জেলায় সহকারী পুলিশ সুপার সদর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে আমজনতার ভালত্বের বিষয়টি মাথায় রেখে অনেক জনসম্পৃক্ত কাজ করেছি৷ আমি যে সমস্ত থানায় অফিসার ইনচার্জ এর দায়িত্ব পালন করেছি সেখানে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চেষ্টা করেছি যা আজও সেসব স্থানের মানুষের স্মৃতির মণিকোঠায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে৷পুলিশ জীবনের গল্প স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবেনা৷ আমার পুলিশ জীবনের গল্প আমি আমার উপন্যাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করে সামন কোন এক সময় আপনাদের সমীপে উপস্থাপন করব৷ হয়তোবা সামনের একুশে বই মেলায় আপনারা আমার জীবনের গল্পের বাকি অংশ ‘এক পুলিশের গল্প, নামের উপন্যাসে খুঁজে পাবেন৷ এতদিন আমার এই উপন্যাসের ধারাবাহিক গল্পের সাথে যারা ছিলেন তাদের আমার প্রাণঢালা শুভেচ্ছা৷ আমার ভালোবাসা কুষ্টিয়ার বহুল প্রচারিত আজকের আলো পত্রিকার কলম সৈনিক মাহফুজ হৃদয়ের প্রতি; সর্বোপরি এই পত্রিকার স্বনামধন্য সম্পাদক জনাব দেবাশীষ দত্ত দাদার প্রতি। সবাই ভাল থাকবেন, আগামী সময় আবার কোন গল্প নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হব৷


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *