এক পুলিশের গল্প (ষষ্ঠ পর্ব)



(লেখক,মোঃ শহিদুল্লাহ,অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা)

আলিফউদ্দিন রোডের ‘বেঙ্গল টি হাউজ’ নামের চায়ের পাইকারি সরবরাহের দোকানে অবসরে মাঝে মাঝে বসি। দোকানের স্বত্বাধিকারী হেলাল আমাকে অনেক সমীহ করেন। আমি দোকানে আসলেই তিনি খুব খুশি হন, তার চায়ের আপ্যায়নের হাত থেকে নিস্তার ছিল না তাই তার ওখানে চায়ের কাপের সাথে নিজেকে কিছু সময় ব্যস্ত রাখতেই হতো। রাতে আলমডাঙ্গা কলেজের কমনরুমে বসে টেলিভিশনে বিশ্ব যুব ফুটবলের খেলা গুলো দেখতাম। হেলালের বেঙ্গল টি হাউজ দোকানটার অবস্থান আলিফ উদ্দিন রোডের সাথেই। এ কারণে রাস্তা দিয়ে যারা যাওয়া-আসা করত তারা দোকানের মধ্যে বসা লোকদের দেখতে পেত। একদিন রাস্তা দিয়ে ক্লাসমেট মঞ্জু তার বাসায় ফিরছিল৷ আমাকে বেঙ্গল টি হাউস দোকানে দেখেই দোকানে ঢুকে পড়লো। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল ‘এখানে কী করো দোস্ত?’ উত্তরে আমি বললাম “সময় কাটাচ্ছি বন্ধু। মঞ্জু হেসে বলল “তোমার জন্য একটা ভালো খবর এনেছি দোস্ত।” আমি আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করলাম “কি খবর বন্ধু বল?” তখন মঞ্জু তার হাতে থাকা সংবাদ পত্রিকা বের করে আমাকে দেখিয়ে বলল “বাংলাদেশ পুলিশে সরাসরিভাবে নিযুক্ত সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে কিছু যোগ্য সুস্থ্য মেধাবী যুবকদের নিয়োগ দেবে। তুমি তো একজন পুলিশ অফিসারের ছেলে এবং ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। তুমি এখানে চেষ্টা করে দেখতে পারো।”আমি মঞ্জুর হাত থেকে সংবাদ পত্রিকাটা নিয়ে পড়লাম। দেখলাম সরাসরিভাবে নিযুক্ত কিছু সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে গ্রাজুয়েট, উচ্চতা কমপক্ষে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, বুকের মাপ ৩৪ ইঞ্চি সম্প্রসারণে ৩৬ ইঞ্চি,ওজন সর্বনি¤œ ১১০ পাউন্ড। আমি মঞ্জুকে-সহ পত্রিকার কপিটা নিয়ে বাবাকে দেখানোর জন্য বাসায় গেলা। বাবা বাসাতেই ছিলেন। বাবাকে পত্রিকা দেখিয়ে বললাম “বাবা সরাসরিভাবে বাংলাদেশ পুলিশে কিছু যোগ্য প্রার্থীকে ভর্তি করবে। আপনি অনুমতি দিলে আমি এই পদের জন্য আবেদন করব।‘আমার কথা শুনে বাবা খুব খুশি হলেন, কারণ তিনি আমাদের দুভাইয়ের মধ্যে যে কোনো একজনের কাছ থেকে এমন কথাই প্রত্যাশা করেছিলেন। বাবা বললেন “ঠিক আছে তুমি আবেদন পত্র রেডি করো, কাল সকালে আমি তোমাকে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন্সের ডিজার্ভ অফিসে নিয়ে যাব৷ সেখানে তুমি আর ও-ওয়ান সাহেবের কাছে তোমার সাব-ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ লাভের আবেদনপত্রটি দাখিল করো। মঞ্জুকে বাসাতে চা নাস্তা খাইয়ে তার বাসার উদ্দেশ্যে বিদায় জানালাম। পরদিন সকালে বাবাকে নিয়ে মধুমতি ট্রেনযোগে সকাল ৯ টা নাগাদ কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনে এসে পৌছালাম। সেখান থেকে রিক্সা যোগে একটু দুরেই কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন্সের রিজার্ভ অফিসে এসে পৌছালাম। বাবাকে সহ রিজার্ভ অফিসে প্রবেশ করতেই সামনে একজন অফিসারকে বসে টেবিলে থাকা কাগজে কি যেন লিখছেন দেখতে পেলাম। বাবা ঢুকেই বললেন ‘ভালো আছেন আর ও সাহেব?’ আর ও সাহেব সামনের দিকে মুখ তুলে বাবাকে দেখতে পেয়ে বললেন “ভালো আছেন নুরুল হক সাহেব?” বাবা উত্তর দিলেন “জি ভালো আছি। ‘আমাকে সাথে দেখে আরো সাহেব বললেন “আপনার সাথের ছেলেটা কে?’ বাবা বললেন ‘আমার ছোট ছেলে শহিদুল্লাহ, সে একজন ভালো ছাত্র; বরাবর ভালো রেজাল্ট করে এসেছে। সেও আমার মত পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হতে চাই, তাই আমি তাকে সাথে করে এনেছি সাব-ইন্সপেক্টর ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদনপত্র দাখি। করাতে।” আর ও ওয়ান সাহেব বললেন “ভালো করেছেন, খুবই ভাল করেছেন; আমাদের ছেলেরাই তো এই মহান পেশাকে বেছে নিয়ে দেশ সেবা করবে। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন ‘ঠিক আছে বাবা, তুমি কি আবেদন পত্র লিখবে না সাথে করে নিয়ে এসেছো?’ আমি জবাব দিলাম “আমি লিখে নিয়ে এসেছি চাচা।” আরও সাহেব আমার হাত থেকে দরখাস্তটা নিয়ে ভালো করে পড়ে দেখলেন। বললেন “ঠিক আছে যাও, তোমাকে সময় মত থানার মাধ্যমে মেজারমেন্ট টেস্ট, রিটেন পরীক্ষা ও ভাইভার জন্য ডাকা হবে।” আমি আর ও সাহেবকে সালাম জানিয়ে বিকেলের ফিরতি ট্রেনে আলমডাঙ্গায় বাসায় ফিরে এলাম। মেজারমেন্ট টেস্ট, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে; এ কারণে নানান উদ্বিগ্নতা আমার মনকে ঘিরে ধরল। মনের কাছে প্রশ্ন রেখে উত্তর পেলাম আমাকে এখন নিয়োগ লাভের নিমিত্ত নিয়োগ বোর্ডের পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার জন্য পড়াশোনা করতে হবে। ঠিক সেই সময় বাসার রেডিওতে নজরুল গীতি শিল্পী খালিদ হোসেনের কন্ঠে ভেসে আসছিল নজরুল গীতি ‘মুসাফির মোছরে আঁখিজল, ফিরে চল আপনারে নিয়া।’


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *