এক পুলিশের গল্প (১০ম পর্ব)



(লেখক,মোঃ শহিদুল্লাহ,অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা)

রাতের আঁধার ভেদ করে আমাকে বহনকারী ট্রেন ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক শব্দে সামনে এগিয়ে চলেছে। জানালার পাশে বসে বাইরে চোখ মেলে প্রকৃতির নিকষ কালো অন্ধকারকে অবলোকন করছি। অন্ধকারে মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠা জোনাকির আলো কিছুটা হলেও আমার মনে ভালোলাগার অনুভূতির পরশ বুলিয়ে চলেছে। সামনের সিটে বসে সেজো ভাই ওলি ট্রেনের মৃদমন্দ ঝাকুনিতে ঘুম পরীর দেশে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। বারবার বাবা মা ছোট বোন দুটির ছবি মানসপটে ভেসে উঠছে। জন্মলাভের পর তাদের সান্নিধ্য ছাড়া খুব একটা বেশি বাইরে থাকিনি তাই মনের অজান্তে চোখের দু’পাশ বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রুবিন্দু তাদের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করছে। আমাকে বহনকারী ট্রেন যখন হলদিগাছি রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম টাচ করলো তখন সবে পূব আকাশে আলোর ছটা আস্তে আস্তে উদ্ভাসিত হতে শুরু করেছে। লাগেজ সহ সেজো ভাইকে নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম। প্ল্যাটফর্মের নিচে এসে জানলাম পুলিশ একাডেমি সারদায যেতে হলে হয় রিক্সা না হয টমটম বাহন হিসেবে বেছে নিতে হবে। ধরাধরি করে একটা টমটমে লাগেজসহ সেজো ভাইকে নিয়ে উঠে পড়লাম। টমটম ওয়ালা টমটম ছেড়ে দিল। টকবক টকবক করে টমটম পিচ ঢালা পথ-এর সাথে মিতালী করে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। রাস্তার দুধারে সবুজ মাঠ, মাথার উপরে নীল আকাশ, সূর্যি মামা কেবল আস্তে আস্তে উপরে উঠতে শুরু করেছে। আমার মনে নানা প্রশ্ন জেগে উঠছে পুলিশ একাডেমিতে আমি যাচ্ছি, জানিনা সেখানে কি হবে, আমাকে কি কি করতে হবে-কারণ এ সম্পর্কের কোন কিছুই আমার জানা নেই। টমটম পুলিশ একাডেমি এর মূল ফটকে পৌঁছাতে ১ ঘন্টা মত সময় নিলো। ভিতরে টমটম যাবার কোন নিয়ম নেই তাই প্রধান ফটকে আমাদের নামতে হলো। নেমে ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলে গেটের প্রহরায় থাকা পুলিশ সদস্য আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কোথায় যাব, কেন এসেছি? আলমডাঙ্গা থানার মাধ্যমে আমাকে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি অফিস থেকে পাঠানো চিঠিটার কপি তাকে দেখালাম। তিনি চিঠি পড়ে বুঝতে পারলেন আমি আউটসাইড ক্যাডেট হিসেবে নিয়োগ পেয়ে এখানে এক বছরের জন্য ট্রেনিং করতে এসেছি৷ তিনি আমাকে বললেন “এই রাস্তা ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যান, পথে কাউকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলে আপনারা কোথায় থাকবেন বলে দেবে। ” আমি গেট থেকে একটা রিক্সা নিয়ে রিক্সায় লাগেজ তুলে দিয়ে সেজো ভাইসহ রিক্সায় বসে পড়লাম৷ রিক্সাওয়ালা পঞ্চাশ গজ সামনে যেতেই সেখানে একজন পুলিশ সদস্যের দেখা পেয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি রাস্তার ডান দিকে একটি ভবন দেখিয়ে বললেন “এই ভবনের দোতলা তিনতলা আপনারা থাকবে। আপনি আপনার পছন্দ মত একটা রুমে ঢুকে পড়েন।” আমি লাগেজ সহ দোতলার একটা রুমে প্রবেশ করলাম। সেখানে থাকা কাঠের চৌকির উপর আমার লাগেজ রেখে দিলাম৷ খুব ক্ষুধা পেয়েছিল, সেজো ভাইকে নিয়ে পুলিশ একাডেমির গেট পেরিয়ে সারদা বাজারে একটা ছোট্ট হোটেলে নাস্তা করতে ঢুকলাম৷ সেখানে দুজনে নাস্তা সেরে নিলাম৷ সেজো ভাই ওলিকে আজকেই বাসায় ফিরে যেতে হ।ে নাস্তা শেষে ভাই আমাকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলে দিলে। ভাই বললেন “ভাই তুইতো এমন পরিবেশে কোনদিন থাকিস নি, মাযের স্নেহের আঁচলে বড় হয়েছিস। এখানে তোকে অনেক কষ্ট করতে হ।ে আমরা কেউ থাকবো না শুধু তুই থাকবি একা আর তোর সাথে থাকবে তোর মতই যারা আউটসাইড ক্যাডেট হিসেবে এখানে প্রশিক্ষণ নেবে তারাই হবে তোর বন্ধু, পরমাত্মীয়৷ এবার আমাকে বিদায় দে ভাই। আমিও চোখ মুছতে মুছতে সেজো ভাইকে বিদায় দিলাম৷ সেজো ভাই আস্তে আস্তে সামনে হাঁটতে থাকলে। একটু সামনে যেয়ে তাকে রিক্সা করে আবার হলদি গাছি রেল স্টেশন ফিরে যেতে হবে। সেজো ভাই যতক্ষণ পর্যন্ত দৃষ্টি সীমার বাইরে না গেলেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার দিকে অপলোকে তাকিয়ে রইলাম। মন কেন জানিনা কেঁদে কেঁদে বলতে থাকলো ‘এই অনন্ত চরাচরে, স্বর্গ মর্ত্য ছেয়ে; সবচেয়ে পুরাতন কথা, সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন৷ যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়; তবু চলে যায়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *