এক পুলিশের গল্প (২য় পর্ব )



নবগঙ্গা নদীর পাড় ধরে হেটে হেটে আমি লক্ষ্মীপাশা খেয়া ঘাটে পৌছে গেলাম৷ খেয়া ঘাটের ইজারাদার ক্ষিতীশ পাটনি আমাকে দেখে হাসি মূখে বললেন “তোমার তো বাবা খেয়া পারের জন্য নির্ধারিত জনপ্রতি এক সিকি অর্থাৎ ২৫ পয়সা দেওয়া লাগবে না৷ তোমার বাবা আমার সাথে খেয়া পারাপার হওয়ার জন্য মাসিক চুক্তি করে রেখেছেন৷ তুমি নিশ্চিন্তে খেয়া নৌকায় উঠে যাও৷” তাহলে যায় কাকা বলে ক্ষিতীশ পাটনীকে সালাম জানিয়ে খেয়াঘাটের নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম৷ ওপার থেকে খেয়া নৌকা তখন পর্যন্ত এপারের ঘাটে এসে ভেড়েনি৷ একটু পরেই খেয়া নৌকার মাঝি হবি ওপার থেকে নৌকা নিয়ে এসে এপারের ঘাটে ভেড়ালো৷ খেয়া থেকে যাত্রীরা নেমে যেতেই হবি আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল “আসেন উঠে আসেন” সে আমাকে বসার জন্য নৌকার গলুইতে একটা পরিষ্কার মাদুর বিছিয়ে দিলো৷ হবি আমাকে খুবই সম্মান করতো৷ বেপারীপাড়ায় হবির বাড়ি৷ বেপারীপাড়ার অবস্থান নবগঙ্গা নদীর পাড়ে৷ আমি খেয়া নৌকায় উঠে বসতেই হবি হাসিমুখে বলল ‘কলেজে যাচ্ছেন?’ আমিও হাসি মুখে প্রতুত্তর করলাম ‘ঠিকই ধরেছো৷’ নবগঙ্গা নদীর প্রবাহমান জলের ধারার সাথে মিতালী করে খেয়া নৌকা ওপারের দিকে এগিয়ে চললো৷ একটু পর এই খেয়া নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ল৷ আমি নৌকা থেকে নেমে কলেজের পথে হাঁটতে শুরু করলাম৷ খেয়া ঘাট থেকে লোহাগড়া আদর্শ কলেজ-এর দূরত্ব এক মাইলের মতো হবে৷ এ পথেও ‘আমি একা শুধু একা আমার সাথে কেউ নেই৷’ কলেজে এসে যখন পৌছালাম তখন ঘড়ির কাঁটাকে সকাল দশটার ঘর ছুঁতে এখনো ২০ মিনিট বাকি৷ আমাকে দেখেই রহমান স্যার বললেন ‘তুমি ঠিক সময়মতো এসে গেছো৷ প্রধান অতিথি সুন্দরবন কলেজের অধ্যক্ষ সাহেব এক ঘণ্টা আগেই এসে গেছেন৷ তিনি বর্তমানে অধ্যক্ষ স ম আনোয়ারুজ্জামান সাহেবের রুমে রয়েছেন৷ অনুষ্ঠান ঠিক দশটায় শুরু হবে৷’ আমি কলেজের লম্বা টিনশেডের হলরুমে পৌঁছে দেখতে পেলাম সামনে স্টেজ সাজানো হয়েছে, হল ঘরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কাঠের বেঞ্চ-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ আমি সামনের দিকের বেঞ্চে বসে পড়লাম৷ দেখলাম ক্লাসমেট জালাল, আসাদ, মিনতি পূর্ণিমা-সহ অন্যান্যরা ইতোমধ্যে চলে এসেছে৷ নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো৷ অধ্যক্ষ শম আনোয়ারুজ্জামান অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন অলংকৃত করলেন৷ অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে স্বাগত বক্তব্য সহ কলেজে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ-সহ অধ্যাপকবৃন্দ অনুষ্ঠান সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোকপাত করলেন৷ অধ্যাপক মন্ডলীর মধ্যে প্রফেসর রহমান সাহেব তার বক্তব্যে বললেনল আমাদের কলেজের সেরা শিক্ষার্থী মোঃ শহিদুল্লাহ আমাদের আদর্শ কলেজ কাননের সুরভিত ফুল৷ সে একদিকে যেমন পড়াশোনায় চৌকস অন্যদিকে তার বহুমাত্রিক প্রতিভা আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছে৷ আমরা জানি সে তার সব্যসাচী গুনের সৌরভ দিয়ে কলেজের সুনাম একদিন চারিদিকে ছড়িয়ে দেবে৷ বক্তৃতা পর্বের- শেষে পুরস্কার বিতরণীর পালা শুরু হলো৷ সুন্দরবন কলেজের অধ্যক্ষ নিজ হাতে বিজয়ীদের মধ্যে পুরুষ্কার বিতরন করবেন৷ পর্যায়ক্রমে গল্প বলা, উপস্থিত বক্তৃতা, কবিতা আবৃতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকারী হিসেবে আমার নাম একের পর এক ঘোষিত হলো৷ আমি সুন্দরবন কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে থাকলাম৷ শেষ পুরস্কার গ্রহণের সময় অধ্যক্ষ মহোদয় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘পদক সম্মাননা পেলে, কেমন লাগছে ?’ আমি উত্তরে বললাম ‘ভালো,খুব ভালো অনুভব করছি স্যার। পুরস্কার পেয়ে আমি খুবই খুশি এবং অনুপ্রাণিত। এই উপহার আমার দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিলো৷ ভবিষ্যতে আরও সুন্দরভাবে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোভাবে কাজ করব। এটা যেমন দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিল, সেই সঙ্গে নতুন সময়ের সূচনা করলো৷” অধ্যক্ষ মহোদয় আরো জিজ্ঞাসা করলেন “তোমার বয়স তো সবে সতেরোর কোঠায়। তুমি কী মনে করো না যে খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে এ সম্মাননা দেয়া হয়েছে?” আমি জবাবে বললাম সম্মাননা প্রদান বয়সের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয় স্যার৷ যে কোনো বয়সে যে কেউ ভালো কাজের স্বাক্ষর রাখবে সে সেই বয়সেই পুরস্কার ও সম্মাননা প্রাপ্তির অধিকার রাখে৷ এ কারণে এই বয়সেই আমাকে সম্মাননা প্রদান কোন ব্যতিক্রমী ঘটনা হতে পারে না৷ সবাই আমাকে যোগ্য মনে করেছেন তাই এই পুরস্কার ও সম্মাননা দিয়েছেন৷এ পুরস্কার বরং আমাকে ভবিষ্যতে আরো ভালো কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করবে৷ আমার জবাবে অধ্যক্ষ মহোদয় বললেন ‘ডঊখ ঝঅওউ’ অনুষ্ঠান শেষে লোহাগাড়া আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ শম আনোয়রুজ্জামান আমার সম্পর্কে আগে বলা প্রফেসর আব্দুর রহমান সাহেবের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন৷ সেদিনকার সুখময় স্মৃতি সাথে করে এনে আমার পরিবারের সবার সাথে শেয়ার করেছিলাম৷
(লেখক,মোঃ শহিদুল্লাহ, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *