করোনার সাথেই রবিউলের সুখের ঘর!



কুমারখালী প্রতিনিধি

নাম তার রবিউল আলম (৪৬)। তিনি পেশায় একজন ড্রাইভার। শুধু ড্রাইভার নয়, তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার এবং জেলার মঙ্গলবাড়িয়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। চাকুরী জীবনের প্রায় ১৪ টি বছর যাবৎ এই মহৎ ও মানবতা সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি। জানা গেছে, এক অজানা অচেনা করোনা ভাইরাসের (কোভিড -১৯) ভয়াল থাবায় হঠাৎ দুমড়ে মুচড়ে গেছে জীবন ও জীবিকা। থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবন। ছিন্ন হয়েছে মানুষের রক্তের বন্ধন। দুরত্ব বাড়িয়েছে স্বামী, স্ত্রী, ভাই,বোন ও আত্মীয় স্বজনদের মাঝে। মানুষ যতদুর সম্ভব চেষ্টা করছে একে অপর থেকে দুরে থাকতে, দুরত্ব বজায় রাখতে। এমন পরিবেশ ও পরিস্থিেিতও সেই প্রাণঘাতী ভাইরাস কোভিড- ১৯ এর সাথেই অধিকাংশ সময় কাটছে রবিউল আলমের। কখনও করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ, কখনও নমুনা নিয়ে ল্যাবে পৌছানো আবার নমুনার ফলাফল নিয়ে হাসপাতালে ফিরে আসা। আবার এ্যাম্বুলেন্সে করে করোনা রোগীকে উপজেলার বাইরে নেওয়া আসার কাজ করেন রবিউল। এযেন করোনার সাথেই সুখের এক সংসার তার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রবিউলের সাথে কথা বলে জানা যায়, গেল বছরের ১৭ মার্চ প্রথম কুমারখালী উপজেলায় করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। সংক্রমণের প্রথম থেকেই সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে কাজ জরছেন রবিউল আলম। মৃত্যুকে সারাক্ষণ লালন করে তিনি ঘুম থেকে উঠেই প্রস্তুতি নেয় বুথে যাওয়ার। সকাল ৮ টায় বুথে গিয়েই ব্যস্ত সময় কাটায় করোনার নমুনা সংগ্রহের কাজে। চলে দুপুর ১ টা পর্যন্ত। এরপর সংগৃহীত মরণঘাতী ভাইরাসের নমুনা এ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে ছুটে যায় কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে। সেখানে চলতি দিনের সংগ্রহকৃত নমুনা কর্তৃপক্ষের নিকট বুঝিয়য়ে দিয়ে গত-দিনের নমুনার ফলাফল নিয়ে আবার ফিরে আসেন কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তবুও দম নেই যেন রবিউলের। এরপর বাকী সময় প্রস্তুত থাকে থাকতে করোনাসহ অন্যান্য রোগী হাসপাতাল ও উপজেলার বাইরে নেওয়া – আনার জন্য। আবার উর্ধতন কর্তা বাবুদের নানান হুকুমও তামিল করতে হয় বিরক্তহীনভাবে তাকে। এছাড়াও দিনে ও রাতের যেকোন সময় ভিআইপিদের বাড়িতে নমুনা সংগ্রহে যান রবিউল। আরো জানা গেছে, এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের পাশাপাশি করোনাকালীন অতিরিক্ত দাঁয়িত্ব পালন করেন তিনি। নমুনা সংগ্রহের ৯০ ভাগ কাজ করেন তিনি। কিন্তু করোনার কোন সুযোগ সুবিধা পাইনা রবিউল। এবিষয়ে এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র নমুনা সংগ্রহকারী রবিউল আলম বলেন, গাড়ি চালানোর পাশাপাশি হাসপাতালে করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ, রিপোর্ট নিয়ে ল্যাবে যাওয়া। ল্যাবের ফলাফল আনা, বিভিন্ন ভিআইপি বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা সহ প্রায় ২৪ ঘণ্টায় ব্যস্ত থাকি। তিনি আরো বলেন, উপজেলায় করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু থেকেই প্রায় ৯০ ভাগ নমুনা আমি সংগ্রহ করি। প্রথম দিকে তিনজন দাঁয়িত্বে ছিল নমুনা সংগ্রহের কাজে। বর্তমানে একজন দাঁয়িত্বে আছেন। আমি কোনদিনই দাঁয়িত্বে ছিলাম না। কিন্তুই আমিই সব সময় নমুনা সংগ্রহের কাজ করে আসছি। কিন্তু কোন পারিশ্রমিক পাইনি। রবিউল বলেন, করোনাকে সবাই ভয় পাই। করোনায় মা, বাবা, ভাই, বোনসহ অনেক আত্মীয় স্বজন দুরে সরে গেছে। কিন্তু আমার করোনা ও রোগীর সাথে থাকতে ভাল লাগে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিবল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আকুল উদ্দিন বলেন, রবিউল খুব ভাল ছেলে। ভাল কাজ জানে। নমুনা সংগ্রহের কাজে একজন নিয়োজিত আছেন। তবুও রবিউলই বেশি কাজ করেন। তিনি আরো বলেন, করোনায় এবার কোন বরাদ্দ নেই। গতবার শুধু খাবারের বরাদ্দ ছিল। কিন্তু রবিউলকে কোনদিনই কিছু দেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজীবুল ইসলাম খান বলেন, রবিউল ভাল কাজ জানে। খুব কর্মঠ। করোনাকালী সম্মানীর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভাল জানে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *