করোনায় মৃত্যুতে রেকর্ড কুষ্টিয়া ও ঢাকা জেলায়


একদিনে কুষ্টিয়ায় আরো ১৭ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ২৭৭

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভয়াবহ এক সপ্তাহ পার করল বাংলাদেশ। শনিবার দেশে সংক্রমণের ৭০তম সপ্তাহ (৪-১০ জুলাই) শেষ হয়েছে। এই সপ্তাহে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭৩ হাজার ৫৯ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৭৭ জনের। পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সোয়া এক বছর ধরে চলমান এই মহামারীতে এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। গত ঈদুল ফিতরের পর থেকে মূলত ঢাকার বাইরে সংক্রমণ বাড়ছে। তবে কিছুদিন ধরে ঢাকায়ও আবার সংক্রমণ ও মৃত্যু ঊর্ধ্বমুখী। গত এক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি ৪০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে খুলনা বিভাগে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৭৭ জন মারা গেছেন ঢাকা বিভাগে।

তবে জেলাওয়ারি হিসাবে গত এক সপ্তাহে করোনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা জেলায়। ঢাকা মহানগরসহ ঢাকা জেলায় এই সময়ে মারা গেছেন ১৬১ জন। আর এই এক সপ্তাহে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০১ জন মারা গেছেন কুষ্টিয়ায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সারা দেশের অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসছেন। ঢাকায় এখন মৃত্যু বেশি হওয়ার এটি একটি কারণ হতে পারে। তা ছাড়া ঢাকায় জনসংখ্যা এবং রোগী দুটোই বেশি।

তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ঈদের পর সংক্রমণ বেড়েছিল। খুলনা অঞ্চলে ঢেউটা শুরু হয়েছে একটু দেরিতে এবং তুলনামূলক জনসংখ্যাও সেখানে বেশি। চলতি সপ্তাহ থেকে সংক্রমণ স্থিতিশীল হতে পারে। তবে মৃত্যু নিম্নমুখী হবে ঈদের পর। এর মধ্যে ঈদকেন্দ্রিক যাতায়াত আবার বেড়ে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। সংক্রমণের শুরু থেকেই রাজধানী ও ঢাকা বিভাগে শনাক্তের সংখ্যা ও মৃত্যু বেশি। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে করোনা শনাক্তের পরীক্ষাও হচ্ছে অনেক বেশি। একক জেলা হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ৭০১ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত। তবে সংখ্যার দিক থেকে মৃত্যু অনেক বেশি হলেও শনাক্ত রোগীর সংখ্যার বিপরীতে ঢাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম। দেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ।

চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ৫ এপ্রিল থেকে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছিল সরকার। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে সংক্রমণ কমতে শুরু করেছিল। মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সংক্রমণে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়। জুনের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। বিশেষ করে খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলের পরিস্থিতি খারাপ আকার ধারণ করে। রাজশাহীতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও খুলনায় এখনো পরিস্থিতি খারাপ। বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের সব জেলাতেই সংক্রমণ বাড়ছে।

এদিকে কুষ্টিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১৩ জন ও উপসর্গ নিয়ে ৪ জন মারা গেছেন। করোনা সংক্রমণের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকায় প্রথম কুষ্টিয়া। জুন থেকে শুরু হয়েছে কুষ্টিয়ায় করোনা দাপট। অস্বাভাবিক হারে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় কুষ্টিয়ায় আশঙ্কাজনক হারে করোনা সংক্রমণের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আরো ২৭৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ১০২৭ টি নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৬.৯৭ শতাংশ। আক্রান্তের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ রোগী সদর উপজেলার।
গতকাল শনিবার রাত ১০টায় কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও কুষ্টিয়া জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জেলায় করোনা সংক্রমিত হয়ে মোট মারা গেছেন ৩৪১ জন। এ নিয়ে কুষ্টিয়ায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৫৮২ জনের।
এদিকে চলমান লকডাউন আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ সময় মানুষকে ঘরে রাখতে মাঠে তৎপর রয়েছেন জেলা প্রশাসন, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গতকাল রোববারে বর্ধিত লকডাউনে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন প্রবেশমুখে, সেনাবাহিনী,র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যদের কড়া পাহারা দিতে দেখা যায়।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের নিয়মিত করোনা আপডেট তথ্যনুযায়ী,গতকাল কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পিসিআর ল্যাব ও এন্টিজেন টেস্ট মোট ১০২৭ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে ২৪৫ জনের নমুনা পজিটিভ হয়। নতুন শনাক্ত হওয়ার রোগীর মধ্যে সদর উপজেলায় ১২৬ জন, কুমারখালী উপজেলায় ৭২ জন, মিরপুর উপজেলায় ০৮ জন, দৌলতপুরে ৪১ জন, ভেড়ামারায় ২৩ জন ও খোকসায় ০৭ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কুষ্টিয়া করোনা হাসপাতালে ৩০০ জন ভর্তি আছেন। তাঁদের মধ্যে করোনায় ২০০ জন ও উপসর্গ নিয়ে ১০০ চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া জেলার পাঁচটি উপজেলায় আরও ১০০ রোগী ভর্তি আছেন।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, গত কয়েকদিনে হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ১৫ জন করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে বর্তমান সময়ে সর্বোচ্চ শনাক্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *