কুষ্টিয়ায় করোনা ওয়ার্ডে একদিনে মৃত্যুর রেকর্ড,বাড়ছে নানামুখী সংকট


নতুন শনাক্ত ১৬৪, সদরে ১০০ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘন্টায় করোনা ওয়ার্ডে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া সবাই করোনা পজেটিভ ছিলেন। শুক্রবার রাত ৮টা থেকে গতকাল শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় করোনা সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন ১৫১ জন। এর মধ্যে গেল রাত ১টা থেকে শনিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ৫ ঘন্টায় আইসোলেশনে মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের।

কুষ্টিয়ায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরো শনাক্ত । এ নিয়ে কুষ্টিয়ায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৩৩৯ জনের। আক্রান্তের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ রোগী কুষ্টিয়া শহরকেন্দ্রিক। বিশেষ করে ঈদের পর থেকে এই সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের নিয়মিত করোনা আপডেট তথ্যনুযায়ী, শনিবার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পিসিআর ল্যাবে মোট ৫৪৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে ১৬৪ টি নমুনা পজিটিভ হয়। পরীক্ষার বিপরীতে আক্রান্তের হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। নতুন শনাক্ত হওয়ার রোগীর মধ্যে সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ১০০ জন, কুমারখালী উপজেলায় ২৪ জন, মিরপুর উপজেলায় ৭ জন, দৌলতপুরে ১৬ জন, খোকসা উপজেলায় ৪ জন ও ভেড়ামারা উপজেলায় ১৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতের আবাসিক চিকিৎসক(আরএমও) ডা. তাপস কুমার সরকার জানান, মারা যাওয়া প্রত্যেকরই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই অবস্থা অনেক খারাপ ছিলো। তাদের ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছিলো। তিনি জানান, একদিনে এ যাবতকালের সব থেকে বেশি মৃত্যু।

এদিকে, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে ১০০ শয্যার বিপরিতে বর্তমানে ১১৩ জন রোগি ভর্তি রয়েছেন। ওয়ার্ডে নতুন করে আর কোন রোগি ভর্তির সুযোগ নেই। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জেনারেল হাসপাতাল থেকে ৩০ জন সাধারণ রোগিকে পাশের মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ডায়াবেটিক হাসপাতালে স্থানান্তর করেছে কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ১০০টি বেডের বিপরীতে হাসপাতালে ১০টি বেডে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে। অতিরিক্ত রোগীদের সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। সিলিন্ডারের মাধ্যমে রোগীর চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো থেকে যেসব রোগিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে, সেসব রোগির প্রত্যেকেরই অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে।

# শনিবার রাত ৮ট পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু

# ৫ ঘন্টায় করোনা ওয়ার্ডে ৭ জনের মৃত্যু

# করোনা ওয়ার্ডে চাপ সামলাতে হিমশিম

# চারজন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত

# হাসপাতালে আসছেন না মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা

সকালে কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স থেকে ভাইকে নিয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আসা সৌরভ উদ্দিন বলেন, ভাইয়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কুমারখালী স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ভর্তি করেছিলাম। শনিবার সকালে সেখান থেকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করে। চিকিৎসকরা বলেছিল রোগীর জন্য সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালে এসে দেখি বেড নেই। কোন রকম ভর্তি হলেও চিকিৎসকদের তৎপরতা ছিল না। তাছাড়া ওয়ার্ডে অক্সিজেনের ঘাটতি ছিল।

নাম না প্রকাশের শর্তে জেনারেল হাসপাতালে একজন চিকিৎসক বলেন, করোনা ওয়ার্ডে রোগী যেভাবে বাড়ছে এতে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাছাড়া চারজন চিকিৎসক করোনা পজেটিভ হওয়ার পর থেকে মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা হাসপাতালে আসছেন না। এতে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সত্যিই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এদিকে এই পরিস্থিতিতে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি গত ১১ জুন মধ্য রাত থেকে অধিক সংক্রমিত কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় ৭ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। তবে এই বিধিনিষেধ অনেকটা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। মাঠ পর্যায়ে তা খুব একটা কার্যকর হতে দেখা যায়নি। শুক্রবার ওই বিধিনিষেধের মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে আরো ৭ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে করোনা প্রতিরোধ কমিটি। তবে শনিবার সকাল থেকে এই বিধিনিষেধ কার্যকর করতে প্রশাসনের ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করা গেছে।

সিভিল সার্জন ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। এই নিয়ে করোনা প্রতিরোধ কমিটির জরুরি সভা হয়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য উপজেলা থেকে করোনায় আক্রান্ত রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চলে আসছে। এতে চাপ বাড়ছে। তবুও আমাদের চিকিৎসার কোন অবনতি নেই। আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা প্রদান করছি। অক্সিজেনের ঘাটতি এখনো হয়নি। যা অক্সিজেন আছে তাই দিয়ে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *