কুষ্টিয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে গম চাষ!


ইজাবুল হক

এক সময় দেশের দ্বিতীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনের তালিকায় নাম ছিলো গমের। সাধারনত রবি মৌসুমে দেশের প্রায় সব জেলাতেই গমের চাষ কম বেশি হয়ে থাকতো পরিবারের খাদ্য বৈচিত্র্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য। বর্তমানে দেশে গমের চাষ সংঙ্কুচিত হলেও আগের তুলনায় গম জাত প্রক্রিয়া খাদ্যের চাহিদা ও ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণে। তবে সে তুলনায় গমের চাষ না বেড়ে বরং কমতে কমতে প্রায় তলানিতে ঠেকে গেছে। কুষ্টিয়া জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলার মাঠ ঘুরে কৃষকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, একসময় যে সমন্ত উঁচ্চু মাঝারি উঁচ্চু জমিতে রবি মৌসুমে প্রায় বিনা সেচে গমের চাষ করতেন কৃষকেরা। বর্তমানে সেই সমন্ত জমিতে দেখা যায় গভীর স্যালোইঞ্জিন চালিত ও বিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প স্থাপন করে রবি মৌসুমে গমের পরিবর্তে বোরো ধান চাষের আওতায় এনেছেন। একটু যদি আমরা পেছনে ফিরে তাকায়। এইতো ক’বছর আগের কথা সকাল হলেই গ্রামের অধিকাংশ কৃষকের বাড়ীতে দেখা যেতো গৃহীনিরা সকালের খাবারের জন্য নিজ জমিতে ফলানো গমের আটার রুটি বানিয়ে খাবার পরিবেশন করতেন। কিন্তু এখন আর এমন দৃশ্য গ্রামের বাড়ীতে তেমন একটা চোখে পড়েনা বললেই চলে। এতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকা হতে খাবারের বৈচিত্র্য বদলে বর্তমানে শুধুই ভাতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। খাবারের তালিকা থেকে বৈচিত্রতা চলে যাওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে ক্রমশয় অসুস্থ্যতার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে দিন দিন।
কুষ্টিয়া অঞ্চলের বিএডিসি’র গম বীজ বিক্রয় তথ্যসূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে ৩৯২ টন গম বীজ , ২০২০ সালে ৬২৩ টন গম বীজ ও চলতি মৌসুম ২০২১ সালে ৪৫৭ টন উন্নত জাতের গম বীজ বিএডিসি’র নির্ধারিত ডিলারদের মাধ্যমে কৃষক পর্যায় বিক্রি করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি নির্ভরশীল দেশে হওয়া সত্ত্বেও গমজাত প্রক্রিয়া খাদ্যের বৃহৎ চাহিদা মেটাতে দেশের অর্থ খরচ করে আমদানী করতে হচ্ছে গম। অথচ একসময় দেশেই উৎপাদিত গম দিয়েই দেশের চাহিদার সিংহভাগ মেটানো হয়ে থাকতো।
জানা যায়, একর প্রতি গমের বীজের পরিমান লাগে ৬০ কেজি। সে হিসেবে দেখা যায় কুষ্টিয়া জেলায় ২০১৯ সালে চাষ হয়েছিলো ৬৪৩৩ একর, ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১০৩৮৩ একর ও সর্বশেষ চলতি মৌসুম ২০২১ সালে গমের চাষ না বেড়ে বরং কমে দাঁড়িয়েছে ৭৬২০ একরে। কৃষিতে উন্নত আধুনিক সব যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির যোগ হলেও দেশে গমের চাষ বৃদ্ধি না পেয়ে চাষ কমছে আশঙ্কাজনক হারে। যা আমাদের গমজাত প্রক্রিয়া খাদ্যের চাহিদা মেটাতে আমদানীর উপর প্রায় সবটুকুই নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হচ্ছে গম চাষের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও।
কুষ্টিয়ার মিরপুর এলাকার বেশ কয়েকটি মাঠ ঘুরে কৃষকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, গম চাষে প্রাকৃতিক দূর্যোগ বোরো ধান চাষ অপেক্ষা অনেকাংশে কম। এমন কি প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঝুঁকি নেই বললেই চলে। অন্যদিকে বোরো ধান চাষে প্রাকৃতিক ঝুঁকি রয়েছে শতভাগ। যা আমাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তার জন্য বেশ হুমকি স্বরুপ। কালবৈশাখী ঝড় শিলাবৃষ্টির মত প্রাকৃতিক ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে বোরো ধানের চাষ হয়ে থাকে।
এবছর মালিহাদ গ্রামের কৃষক আলম এক বিঘা, শ্রীরামপুর গ্রামের কৃষক মহিবুল ইসলাম ২ বিঘা, কাকিলাদহ গ্রামের কৃষক ডাক্তার আব্বাস আলী ২ বিঘা, ও শেখ আজিবার ১ বিঘা জমিতে বিএডিসির উন্নত জাতের গমের চাষ করেছেন। এছাড়া কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ীর মাজিলা গ্রামের কৃষক আছের আলী ১ বিঘা, আতিয়ার রহমান ১ বিঘা জমিতে গমের চাষ করেছেন। তারা বলেন, গম চাষ করতে তাদের কোন বাড়তি অর্থ খরচ করে সেচের প্রয়োজন হয়নি এবছর। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার মধুপুর গ্রামের বোরো ধান চাষী সারজেন আলী বলেন, তার এক বিঘা বোরো ধান চাষ করতে প্রায় ৩০ বার সেচ দিতে হবে এতে করে ৩০ লিটার ডিজেল কিনতে হবে। যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০০ হাজার টাকা ও স্যালোইঞ্জিন ভাড়া দিতে হবে ১০০০ হাজার টাকা। শুধু অতিরিক্ত সেচ খঁরচই নয় সাথে প্রায় চারগুণ বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় গম অপেক্ষা বোরো ধান চাষের জন্য। আর অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি পানি ও বাতাস হচ্ছে দূষিত। অপরদিকে পরিবেশর উপর বিরুপ প্রভাবের ফলে জীববৈচিত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষিবীদরা বলছেন,মহামারি সংক্রমিত রোগের প্রাদূর্ভাবের কবল থেকে গম ক্ষেত রক্ষা করতে না পারায় গম চাষে নিরুৎসাহিত ও চাষ না করার জন্য কৃষি অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কৃষি অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেশ কয়েক বছর গমের চাষ ছেড়ে দিয়ে এবছর আবার পরীক্ষামূলকভাবে লাভজনক গমের চাষ করেছেন অল্প জমিতে। বোরো ধান পাকা পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ করতে হয় সেচ বাবদ। এতে করে একদিকে যেমন রবি মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ সুপেয় পানির যথেচ্ছা ব্যবহার হচ্ছে অন্যদিকে খরচ হচ্ছে আমাদানীকৃত জ্বালানি। যা উঁচ্চু ও মাঝারি উঁচ্চু জমিতে বোরো ধানের চাষ সম্প্রসারনে দেশের অর্থ চলে যাচ্ছে অতিরিক্ত জ্বালানি, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক আমদানী করতে যেয়ে। তাছাড়া ইঁদুরের উপদ্রব বৃদ্ধি,গমের ব্লাষ্ট রোগ, পরিকল্পনার অভাব ও ধানের বাজার দর ভাল হওয়ায় গত বছরের তুলনায় এ বছর চাষ কমেছে।
কৃষকদের গম চাষ করতে যেয়ে সবচেয়ে বেশি কি কি সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়। এবিষয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা, প্রমত গম যখন পাকতে শুরু করে তখন গমের গাছ দ্রুত শুকিয়ে যেতে শুরু করে, যার জন্য গমের দানা পুষ্ট হতে না পেরে অপুষ্ট হয়। এতে গমের ফলন খুবই কম হয় আর বাজারে বিক্রিও করতে পারেনা ও ইঁদুরের আক্রমনের স্বীকার হতে হয়। কৃষি বিষেজ্ঞগদের মতে দ্রুত আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে উন্নত জাতের গম রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। যার জন্যই দেশে পর্যপ্ত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গমের চাষ সম্প্রসারন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সেই সাথে রবি মৌসুমে যেখানে সুপেয় ভূ-গর্ভস্থ পানি ছাড়াই লাভজনক গমের চাষ করে থাকতেন কৃষকেরা। বর্তমানে কৃষকেরা ঐসমন্ত জমিতে গমের পরিবর্তে বোরো ধানের চাষ করছেন। গমের চাষ কেন দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, কুষ্টিয়ার কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)’র আঞ্চলিক ডিএডি শিশির কুমার বলেন, গমের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ফলে সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। যা প্রতিরোধ ও নিরাময় করা অসম্ভব হয়ে উঠছে ও বর্তমানে ধানের বাজার দর একটু উন্নত হওয়া। এজন্যই কৃষকেরা গমের চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *