চেয়ারম্যানের ঘেরে মাছ চুরির অভিযোগে কৃষককে পিটিয়ে হত্যা


=দড়ি দিয়ে বেঁধে হাসপাতালে নেয় গ্রাম পুলিশ=

বিশেষ প্রতিবেদক

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার রতনপুর গ্রামে ঘের থেকে মাছ চুরির অভিযোগ এনে এক কৃষককে পিটিয়ে হত্যা করেছে আয়ুব আলী বিশ্বাস নামে এক ইউপি চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের সদস্যরা। আয়ুব আলী বিশ্বাস খোকসা উপজেলার ১নং খোকসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
মঙ্গলবার(১৫ জুন) ভোর চারটার দিকে জসীম শেখ (৩৫) নামের ওই কৃষককে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত জসীম শেখ উপজেলার খোকসা ইউনিয়নের রতনপুরে গ্রামের রওশন আলীর ছেলে।

#পুলিশের নির্দেশে দড়ি দিয়ে বাঁধার অভিযোগ

#থানায় মামলা দায়ের

#চেয়ারম্যানের স্ত্রী ও ভাতিজা গ্রেফতার

#নিহতের নামে থানায় চোরের কোন অভিযোগ নেই

#ভাইয়ের অভিযাগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা

কৃষককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী সহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন নিহত জসিম শেখের ভাই হাসিম শেখ। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানের স্ত্রী জাহিদা খাতুন ও ভাতিজা সালাউদ্দিনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান আয়ুব আলী বিশ্বাস।

এলাকাবাসী জানায়, মাছ চুরির অপরাধে জসিমকে চেয়ারম্যানের বাড়িতে পিটানো হচ্ছে। এমন খবর পেয়ে তারা চেয়ারম্যান বাড়িতে যান। গিয়ে তারা দেখেন, জসিম মুমূর্ষু অবস্থায় উঠানে পড়ে আছে। সেখানে চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যানের তিন ছেলে, ভাতিজা, পুলিশ ও অনেক লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
এসময় জসিম শুধু পানি পানি আর মা মা করছিল। গ্রামের এক মহিলা পানি পান করান এবং পুলিশ একটি ভ্যানযোগে গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে ভ্যানে দড়ি দিয়ে বেঁধে খোকসা হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

চেয়ারম্যান আয়ুব আলী বিশ্বাস

নিহতের স্ত্রী আছিয়া খাতুন বলেন, রাতে খেলা দেখতে বাড়ির বাইরে যায় জসিম এবং রাতেই বাড়ি ফিরে আসে। এরপর ফজরের আযানের আগ মূহূর্তে খেচুরি খাওয়া জন্য একটি ফোন আসে। ফোন পেয়ে তিনি বাড়ির বাইরে গিয়ে আর ফিরেনি। এরপর ভোরে শুনতে পায় চেয়ারম্যান ও তার ছেলেরা খুঁটিতে বেঁধে পেটাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমার স্বামীর কারো সাথে কোন ঝামেলা ছিলোনা। সে মাঝেমাঝে মাছ ধরত। কিন্তু সে চোর নয়।

তিনি অভিযোগ করেন, স্বামীর আহত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন কিন্তু চেয়ারম্যানের লোকজন তাকে স্বামীর কাছে যেতে বাধা দেয় এবং হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেয়।
চেরের খবর পেয়ে খুব সকালে চেয়ারম্যান বাড়িতে যায় রতনপুর গ্রামের মৃত মুন্তাজের ছেলে মুন্নাফ। তিনি বলেন, খবর পেয়ে চেয়ারম্যান বাড়িতে এসে দেখি পুলিশ, চেয়ারম্যানসহ অনেক লোক। আর জসিম মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝেমাঝে শুধু বলছে পানিই পানিই, মা-আ, মা-আ।
তিনি আরো বলেন, এরপর চৌকিদার রাকিব ইমন কাঁধে তুলে ভ্যানের উপর নেয়। এসময় নানান লোক নানান কথা বলছিল। পরে পুলিশ বলে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলতে। পরে চৌকিদার আর ভ্যানচালক বেঁধে ফেলে জসিমকে। এসময় জসিম দুইবার ঝাঁকি মারে উঠে।

খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. প্রেমাংশ ঘোষ বলেন, অজ্ঞান অবস্থায় সকাল ৬ টা ৩৫ মিনিটে একজন চৌকিদার (গ্রাম পুলিশ) জসিমকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করি। চিকিৎসা শুরুর ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মাথায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, তার শরীরের একাধিক স্থানে আঘাতের চিহৃ ছিল। মূলত মাথায় মারাত্মক জখমের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের ভাই আসলাম আলী শেখ বলেন, ভোর ৫ টার দিকে স্থানীয় মেহেদী নামের এক ব্যক্তি তাকে ফোনে জানায় জসিমকে চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বিশ্বাস, তার তিন ছেলে তানজির বিশ্বাস, তানভীর বিশ্বাস, জুমেজো বিশ্বাস ও ভাতিজা সালাউদ্দিন, জিকু তাদের বাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়ে মারপিট করছে। সংবাদ পেয়ে চেয়ারম্যানের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পায় মারাত্মক আহত অবস্থায় উঠানে পড়ে আছে।
তিনি আরো বলেন, এসময় আমার ভাই পানি পানি করছিল। এরপর আমি একটু পানি দিই। সে আবারো পানি পানি করছিল। আমি আবারো পানি খাওয়ায়। তখনও যদি আমার ভাইকে হাসপাতালে নিত, তাহলে সে বেঁচে যেত বলে জানান নিহতের ভাই আসলাম।

নিহতের আরেক ভাই হাসেম শেখ বলেন, আমি মেম্বর প্রার্থী। আমাকে দাবিয়ে রাখার জন্য চেয়ারম্যান লোকজন দিয়ে ভাইকে হত্যা করেছে। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক কারনে আমার ভাইকে মারার প্লান ওদের অনেক আগেই ছিল।
ওই গ্রামের মোঃ সুমন বলেন, সোমবার রাতে চেয়ারম্যানের পুকুর থেকে মাছ চুরির অভিযোগে জসিমকে ডেকে চেয়ারম্যানের পাকা বাড়ির উঠানের পাশে খুঁটিতে বেঁধে পেটায়। এতে জসিম মারাত্মক আহত হয়। পরে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যুর খবর পায়।

চেয়ারম্যান পাড়ার আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী জবেদা খাতুন বলেন, সকালে শুনলাম ওই বাড়ি চোর ধরেছে। তারপর গিয়ে দেখি ওই ছেড়া (জসিম) আছারি বিছারি (মাটিতে গড়াগড়ি) করছে। মারাটারা দেখি নাই। খালি পানি পানি করছে। এরপর দুইবার পানি দিলাম, ও (জসিম) খালো (পান করল)। তিনি আরো বলেন, ওতো চোর না। মাছ একজন ধরতে পারে। তাই বলে পিটিয়ে মারা ঠিক হয়নি।
ঘটনার পর থেকে ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী পলাতক থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

খোকসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আশিকুর রহমান বলেন, মাছ চুরির সন্দেহে চেয়ারম্যান আইয়ুবের বাড়িতে জসিমকে পিটানো হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে খোকসা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করেছে নিহতের ভাই। ঘটনার পর চেয়ারম্যানের স্ত্রী জাহিদা ও ভাতিজা সালাউদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন গ্রাম পুলিশকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তবে নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় কোন চুরির মামলা নেই।

এদিকে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, জসিম তো চোর নয়। তাকে এভাবে না মারলেও হত। আর পুলিশ ঘটনাস্থলে সময় নষ্ট করেছে। সময়মত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে জসিমকে হয়তো বাঁচানো যেত। এছাড়াও একজন মুমূর্ষু ব্যক্তিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নেওয়ার বিষয়টি পুলিশের অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন তারা। এবিষয়ে ভ্যান চালক আবেদ আলী শেখ বলেন, চোর দেখতে গিয়েছিলাম সেখানে। পরে ওরা আমার ভ্যানে জসিমকে মুমূর্ষু অবস্থায় ভ্যানে তোলে। এসময় তাকে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছিল।

চেয়ারম্যান বাড়িতে দায়িত্ব পালনে যাওয়া খোকসা থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) ইমদাত বলেন, আমি চেয়ারম্যান বাড়িতে গিয়ে তাকে সুস্থ অবস্থায় পেয়েছি। ওর সাথে আমার কথা হয়েছিল। কাছে হ্যান্ডক্যাপ না থাকায় দড়ি দিয়ে বেঁধে ভ্যানযোগে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

মুমূর্ষু ব্যক্তিকে দড়ি দিয়ে বাঁধা ও কালক্ষেপণের বিষয় অস্বীকার করে খোকসা থানার ওসি সৈয়দ আশিকুর রহমান বলেন, চৌকিদারের মাধ্যমে ভোর ৪ টা ৪৫ মিনিটে মুঠোফোনে খবর পেয়ে পুলিশ পাঠায় ঘটনাস্থলে। ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যে ভিকটিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *