জিকে খাল গিলে খেলো কুমার নদকে !



ইজাবুল হক

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কুমার নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৪ কিলোমিটার গড় প্রস্থ ৭৫ মিটার। পদ্ম নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে কুষ্টিয়া,চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা হয়ে মাগুরা জেলায় অবস্থিত অন্যতম নদ কুমার। তৎকালিন সময়ে সড়ক পথের তেমন একটা উন্নতি না থাকায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিলো কুমার নদ। কুমার নদকে ঘিরেই সে সময়ে কুষ্টিয়া চুয়াডাঙ্গা ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলায় গড়ে উঠেছিলো ছোট বড় হাট বাজার শহর ও ব্যবসার কেন্দ্র।

জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার আলমডাঙ্গা শহর, জেলার বৃহত্তম পশুহাট, জামজামি বাজার, শ্রীরামপুরের হাট, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ী, গোস্বামী দূর্গাপুর, মনোহরদিয়া, ঝাউদিয়া হাট বাজার সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিলো কুমার নদের পাড়ে। ঝিনাইদহ জেলার ভবানীপুর বাজারও কুমার নদের পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছিলো।

কুমার নদ পাড়ের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সে সময় রাস্তাঘাট ভালো না থাকায় এক জেলা থেকে অন্য জেলা ও বাজারে পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াতের জন্য অন্যতম সহজ মাধ্যম ছিলো কুমার নদ। আলমডাঙ্গা উপজেলার বকসিপুর, শ্রীরামপুর, মাজু, অভয়নগর, ছত্রপাড়া, জামাজামি, ঝিনাইদহের ভবানীপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে কুমার নদ প্রায় সারা বছরই পানির অভাবে একটি মরা খালে পরিনত হয়ে পড়ে রয়েছে। এই সমন্ত এলাকায় বহুবছর ধরেই কুমার নদে ঘাস জঙ্গল কচুড়িপানা জন্মে থাকে পানির অভাবে। আবার কোথাও দেখা যায় দখলের কবলে পড়ে সরু নালায় পরিণত হয়ে ধুকছে এক সময়ের প্রবল স্রোতের কুমার নদ। তবে কুমার নদের আজকের এই ভয়াবহ পরিনামের পিছনে রয়েছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ জিকে খালের সৃষ্টির শুরুতেই।

সূত্রে জানা যায়, তৎকালিন সময়ের সরকার ১৯৬১ সালে গঙ্গা-কপোতাক্ষ জিকে খাল খনন শুরু করেন কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থেকে। সরজমিনে গিয়ে দেখে যায়, জিকে খালটি মিরাপুর উপজেলার বাজিতপুর গ্রামে এসে কুমার নদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিজের (জিকে খালের) বক্ষে ধারন করে আলমডাঙ্গায় এসে উগ্রে দিয়েছে। বাজিতপুর ও আলমডাঙ্গায় কুমার নদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দু’টি স্লুইসগেট নির্মন করে কুমার নদের নিজস্ব পানির স্রোতধারায় গতিরোধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৯৬১ সালে জিকে খাল খননের সময় কুমার নদের নিজস্ব পানির প্রবাহ রুদ্ধ করায় কুমার নদ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে তার যৌবন এমনটাই ধারনা এলাকাবাসীর।

মিরপুরের বাজিতপুর ও আলমডাঙ্গার হাউসপুরের শ্মশানঘাট নামক স্থানে কুমার নদ পাড়ে বসবাসরত বাসিন্দারের সাথে কথা বলে জানা যায়, যখন জিকে খালে অতিরিক্ত পানির চাপের সৃষ্টি হয় তখনই কেবল কুমার নদের সংযোগস্থলের স্লুইসগেট খুলে পানি দেওয়া হয়। কুমার নদ যখন জিকে খালের পানির করুনার পাত্রে পরিনত হয়ে পড়ে তখনই একটি সুযোগ সন্ধানি মহল কুমার নদের বুকে বাঁধ দিয়ে খন্ড খন্ড করে মাছ চাষের জন্য ইজারা নিয়ে জিকে খালের স্লুইসগেট সারা বছরই প্রায় বন্ধ রাখেন আর নিজেদের সুযোগসুবিধা মত স্লুইসগেট খুলে পানি নিয়ে থাকেন। এদিকে কুমার নদ জিকে খালের গর্ভে অবরুদ্ধ হওয়ায় কুমার নদ বঞ্চিত হয়েছে তার নিজস্ব পানির প্রবাহ থেকে। নিজস্ব পানির প্রবাহ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় জীববৈচিত্রে পড়েছে বিরুপ প্রভাব সেই সাথে বিলুপ্ত হয়েছে অসংখ্য জলজ প্রানী ও দেশীয় প্রজাতির মাছ। যা ছিলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদ স্বরুপ প্রাকৃতিক সম্পদ। কুমার নদপাড়ের হাজারও মানুষের আয়ের পথ ছিলো কুমার নদের প্রাকৃতিক মৎস্য আহরণের মাধ্যমে। শুষ্কমৌসুমে কৃষি কাজেও ব্যবহৃত হতো কুমার নদের পানি।

নদপাড়ের জেলেদের সাথে আলাপচারিতায় জানা যায়, যখন কুমার নদে স্রোতে চলতো তখন নদে প্রচুর পরিমানে দেশীয় প্রজাতির, শিং, কৈই, মাগুর, বোয়াল, ভেদা, ফলৈই, পাপদা, চিংড়ি, শোল, গজাড়, টাকি, শরপুটি, মলা ঢেলা, চিতল, পাঙ্গাস, টেংরা, তারাবাইম, বাইম, গৈচা, নাচপি, খয়রা, আইড়, চাঁদা, খৈলশা সহ হরেক প্রজাতির মাছ। সেই সাথে রুই ও কার্পজাতীয় মাছেদের নিরাপদ প্রজননের স্থানও ছিলো প্রবাহমান কুমার নদ। কুমার নদে ঐ সময় দেখা মিলতো হরেকরকমের পারিযা পাখিদেরও।

তবে কুমার নদের অনেক স্থান ঘুরে দেখা যায়, কুমার নদকে জীবিত রাখতে খন্ড খন্ড স্থানে খননও করে থাকেন মাঝে মধ্যে। কুমার নদ পাড়ের বাসিন্দা ও সচেতন মহল বলেন, কুমার নদকে যতদিন না জিকে খালের রুদ্ধতা থেকে উদ্ধার করে কুমার নদের পানির প্রবাহ পথ তার নিজস্ব চলা চলার জন্য মুক্ত করা না যায়, তাহলে কুমার নদের এমন খন্ড খন্ড খনন কাজ করে কুমার নদকে তার হারানো যৌবনে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কুমার নদের নিজস্ব পানি প্রবাহের পথ রুদ্ধ রেখে খনন করলে শুধুই টাকার অপচয় হবে, কাজের কাজ কিছুই হবেনা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *