জেলা শহরে বেসরকারী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় চিকিৎসা সেবা হবে সহজলভ্য



দেবাশীষ দত্ত

মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি হলো উপযুক্ত চিকিৎসা প্রাপ্তি। চিকিৎসাসেবা দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দেয়ার প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তা সহজলভ্য হয়ে উঠছে না। জেলা শহরগুলোতে এ আয়োজন বাস্তবায়ন হতে পারছে না ব্যক্তি উদ্যোগের অভাবে। আবার ইচ্ছে থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না বিভিন্ন জটিলতায়। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে কি পরিমাণ রোগী হাসপাতালে ছুটছে, তা বোঝা যায় বড় শহরের হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করলে। এদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাজেটে বিশেষায়িত ও সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাজেটে ঢাকা,নারায়ণগঞ্জ,গাজীপুর,চট্টগ্রাম এবং বিভাগীয় শহরের বাইরে জেলা শহরে বেসরকারি উদ্যোগে হাসপাতাল তৈরি করার ক্ষেত্রে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই সুযোগ মিলবে। তবে শিশু ও নবজাতক, নারী ও মাতৃস্বাস্থ্য, অনপকালজি, ওয়েল বিং ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন ইউনিট থাকা সাপেক্ষে ন্যুনতম ২৫০ শয্যার সাধারণ হাসপাতাল এবং ন্যুনতম ২০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপিত হলে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছরের জন্য এই কর অব্যাহতি পাবে। কুষ্টিয়া শহরেও বিশ^মানের একটি হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে। তবে এটি সরকারি নয়, ব্যক্তি উদ্যোগে করা হচ্ছে। শহরের উপজেলা মোড়ে বহুতল ভবনের এ হাসপাতালটি তৈরি করছেন দেশের অন্যতম করপোরেট প্রতিষ্ঠান বিআরবি গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মজিবর রহমান। এছাড়াও কুমারখালীর আলাউদ্দিন নগরে ব্যক্তি উদ্যোগে হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল লি: এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ¦ আলাউদ্দিন আহমেদ। ইতিমধ্যে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের ৩০ শতাংশ কাজ তিনি শেষ করেছেন। তাছাড়া দৌলতপুর উপজেলায় ব্যক্তি উদ্যোগে ২০ শয্যা বিশিষ্ট আনোয়ারা বিশ^াস মা ও শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্টা করেছেন শিল্পপতি নাসির উদ্দিন বিশ^াস। তবে বর্তমানে হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাজেটে বিশেষায়িত ও সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার যে প্রস্তাবনা এসেছে তা বাস্তবায়ন হলে ব্যক্তি উদ্যোগে মান সম্মত হাসপাতাল নির্মাণে কোন পরিকল্পনা আছে কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে আলহাজ¦ আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলা শহরগুলোতে বেসরকারী উদ্যোগে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে স্বাস্থ্য অধিকার সুরক্ষার জন্য সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলেই সম্মিলিতভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন বাস্তবে পরিণত হবে। বাজেট প্রস্তাবনার অনেক আগেই আমি নিজ উদ্যোগে তহিরুন নেছা মেমোরিয়াল হাসপাতালের কাজ শুরু করেছি। ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের ৫৫ শতাংশ মানুষ এখনো মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে ও সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে, অথচ আমাদের দেশে চিকিৎসা পেতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, এর ৬৭ শতাংশই রোগীকে বহন করতে হচ্ছে।
শহরের বাসিন্দা মাহাবুব রহমান জানান, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বৈষম্য আছে। বৈষম্য আছে গ্রামে ও শহরে, আছে ধনী ও দরিদ্র শ্রেণীতে। শহরের মানুষ গ্রামের মানুষের চেয়ে স্বাস্থ্যসেবা বেশি পাচ্ছেন। আবার জেলা শহরগুলোতে মান সম্মত হাসপাতাল নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভাগীয় শহরে ছুটতে হচ্ছে। একদিকে সময়,অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষত্রে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। সেটা সরকারী হোক আর বেসরকারী হোক। হাফিজ আল আসাদ নামে একজন বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা শহরগুলোতে গেলে অনেক হাসপাতালে সেবার চেয়ে ভোগান্তিই পোহাতে হয় বেশি। সমান চিকিৎসা ব্যবস্থা যদি জেলা শহরেও থাকতো তাহলে সেবা পাওয়া সহজলভ্য হয়ে যেতো। এজন্য জেলা শহরে মান সম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সমাজের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের তো আর বড় বড় বেসরকারী হাসপাতাল ও দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সামর্থ্যে নেই। কুষ্টিয়া জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান লাকী মনে করেন,সরকারের এই ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এর জন্য সমাজের সামর্থ্যবোনদের এগিয়ে আসতে হবে। আবার মনে রাখতে হবে এই সুযোগ যেন কৌশল না হয়। বেসরকারী উদ্যোগে বিশেষায়িত বা সাধারণ হাসপাতাল তৈরির ক্ষেত্রে শিল্পপতিরা বেশি আগ্রহ দেখায়। মান সম্মত সেবার সাথে কর্পোরেট চিন্তা ভাবনা থাকলে প্রান্তিক মানুষগুলো সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। আমার দাবি বিশ্বমানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় যেন একেবারেই নাম মাত্র হয়। এদিকে, যেসব জেলায় মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেসব জেলার জনগণ আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণের সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। পাশের জেলা থেকে অনেক রোগী এসব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। দুর-দুরান্ত থেকে রোগীরা এসে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যোগাযোগ, আসা-যাওয়া ও খাবারের জন্য নিঃস্ব হয়ে পড়েন। চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন(বিএমএ) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা: আমিনুল হক রতন বলেন,এটা নি:সন্দেহে মহতি উদ্যোগ। যেভাবে রোগী বাড়ছে,সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রয়োজন অনেক বেশি। তবে বেসরকারী উদ্যোগে যে হাসপাতালগুলো প্রতিষ্ঠা করা হবে তা যেন বাণিজ্যিকভাবে গড়ে না ওঠে। তাহলে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *