তাহারেই পড়ে মনে (পর্ব-১)


মো. শহিদুল্লাহ্

যার কোলে বসে প্রথম পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখেছিলাম, পৃথিবীতে বুক ভরে শ্বাস নিয়েছিলাম; তিনি আমার মা৷ নয় মাস দশ দিন যে আমাকে তার জঠোরে রেখে তিলে তিলে মানব সন্তান হিসেবে বড় করেছিলেন, যার গর্ভে জন্মলাভ করে আমি হয়েছিলাম শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি আর কেউ নন আমার গর্ভধারিনী জননী৷
দোল দোল দোলনায় দোল দিতে দিতে আমার রাতের ক্ষুধার কষ্ট ঘোচাতে কত বিনিদ্র রাতই না কাটিয়ে দিয়েছেন মা ৷ হাটিহাটি পা পা করে যখন হাটতে শিখেছি তখন যাতে বাসার পাশের পুকুরে পড়ে না যায় সে দিকে খেয়াল রেখে এক পায়ে নুপুর পরিয়ে ছিলেন মা। বিদ্যাবতি স্বরস্বতী যাতে করে আমার ভিতর বিরাজ করে, সে উদ্দেশ্যে জন্মের ০৬ দিনের দিন আমার মাথার কাছে দোয়াত কলম রেখে ছিলেন মা। লেখাপড়ায় হাতখড়ি দিতে মিনতি মাসীকে মা বলে ছিলেন, ‘দিদি আমার ছেলেকে একটু লেখাপড়া শেখাও’, সে দিন থেকেই আমার লেখাপড়া জীবনের শুরু। ‘ক’ লিখতে কত যে কলম ভেঙ্গেছি তা আজ আর মনে নেই। বাল্যপাঠ রপ্ত করে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি আমার। লেখাপড়ায় তেমন একটা মনযোগী ছিলাম না। মা হাত ধরে বাসা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে স্কুলে রেখে আসতেন৷ প্রাইমারীর পড়ার পাঠ চুকিয়ে মাগুরা একাডেমী স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। ক্লাসমেট বিল্টু, ঘনার সাথে স্কুল ফাঁকি দিয়ে নবগঙ্গা নদীতে বরশি দিয়ে মাছ ধরতাম। ঘরে ফিরতে সন্ধ্যা শেষে বাসায় ফিরে দেখতাম আমার জন্য না খেয়ে মা বসে আছেন।এভাবেই দিনের পর দিন রাতের পর রাত মায়ের ¯েœহের আচঁল তলে থেকে সব পরীক্ষার গন্ডি পেরুলাম। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। তার ইচ্ছা ছিল আমি যেন পুলিশে ভর্তি হই। মা পুলিশের চাকুরী পছন্দ করতেন না। বলতেন না আমার ছেলে পুলিশে যাবে না। পুলিশে গেলে গালি শিখতে হয়। বাবা মাকে না জানিয়ে আমাকে পুলিশ লাইন্সে নিয়ে গেলেন। সরাসরি এস আই পদে ফিট হলাম ৷ কয়েক দিন পর সারদায় যাওয়ার চিঠি আসলে মায়ের সে কি কান্না আত্মীয়-স্বজন অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে মাকে রাজী করালেন। আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনে এসে মা আমাকে সারদার উদ্দেশ্যে ট্রেনে তুলে দিলেন। সারদায় গিয়ে নতুন পরিবেশে পানির মাছকে ডাঙ্গায় তুলে আনলে যেমন হয়, আমার অবস্থা ঠিক তেমনি দাড়ালো। অনেক কষ্টের ট্রেনিং শুরু হলো। ট্রেনিং চলাকালে সারদার ড্রিল গ্রাউন্ডে প্যারেড করার সময় ২২শে ফেব্রুয়ারি সকাল ০৯.০০ টায় আমার কোম্পানির হাবিলদার মেজর মোঃ আব্দুল রহিম আমার কাছে এসে আমাকে জানালেন শহিদুল্লাহ সাহেব আপনার আম্মা অসুস্থ, তিনি আপনাকে দেখতে চেয়েছেন। আপনি ছুটিতে বাড়ী যান। আমাকে এক সপ্তাহ ছুটি দেওয়া হলো। ট্রেন যোগে বিকালে আলমডাঙ্গা স্টেশনে এসে দেখি আমার বন্ধু মঞ্জু আমাকে নেওয়ার জন্য স্টেশনে রয়েছে। তাকে সাথে করে বাড়ী পৌছে দেখি বাড়ীতে অনেক লোকজনের সমাগম। কিছু বুঝে উঠার আগে ছোট বোন পলি ডুকরে কেঁদে উঠে বললো “ভাই মা আর নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত হয়ে গেলাম। দেখলাম উঠানে মায়ের লাশ। এক নজর দেখেই কখন যে জ্ঞান হারিয়েছি জানি না। যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখছি বন্ধু মঞ্জু আমার মাথায় পানি ঢালছে। জ্ঞান ফিরলে অনেক কান্নাকাটি করলাম। সন্ধ্যার আগে মায়ের লাশ কাঁধে করে আলমডাঙ্গা দারুস সালাম কবর স্থানে সমাহিত করলাম। ০৭ দিন পর সারদা ফিরে গেলাম। ট্রেনিং করাকালীন সারাদিন কাজের মাঝে সময় কেটে গেলেও রাতে ঘুমালে মা স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলতেন, “ভাল থাকিস বাবা। মার্তৃবিয়োগের ক্ষত বুকে নিয়ে সারদার প্রশিক্ষন শেষ করে পিএসআই হিসাবে বরিশাল জেলায় যোগদান করলাম। সেখানে বাস্তব প্রশিক্ষন শেষে এসআই হিসাবে কনফার্ম হবার পর নাজিরপুর থানায় সেকেন্ড অফিসার হিসাবে যোগ দিলাম। এভাবে জীবনের চড়ায় উৎরাই পার হয়ে এখনকার আমি। মা আজ কাছে নেই। চাকুরী পাওয়ার পর শৈশব থেকে যে মা আমাকে বড় করেছেন, আমার চাকুরীর টাকায় মাকে কিছুই কিনে দিয়ে তার মুখের হাসি দেখার সুযোগ আমার হয়নি। কোন একটি বিশেষ দিনে মা আমার স্বপ্নে আসেন না। মা আমার চির সময়ের চিরদিনের। তিনি হয়তো জান্নাত বাসিনী হবেন। কিন্তু তাকে সেবা যতœ করতে না পারায় অতৃপ্তি আমাকে চির ব্যাথাতুর করে রাখছে। আর কেবলই মনে পড়ছে। “ মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়েরও চাম পাপস বানালেও ঋণের শোধ হবে না, এমন দরদী ভবে কেউ হবেনা আমার মা৷’

আমি এখন যেখানেই আছি যেভাবেই আছি আমার মতো আমি আছি, কিন্তু পাশে আমার মা নেই৷ গভীর নিশিথে চারিদিকে যখন সুনসান নীরবতা, পিন পতনের শব্দ যখন কানে আসে না; তখন মানস পটে ভেসে ওঠে আমার মায়ের ছবি আর তাইতো হৃদয়ের গভীরে বারবার ‘তাহারেই পড়ে মনে৷’

লেখকঃ রেঞ্জ ডিআইজি কর্তৃক পুরস্কার প্রাপ্ত শ্রেষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা,
নন্দিত লেখক ও গবেষক৷

মোবাইলঃ=০১৭৪০৩০০৬০০


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *