তাহারেই পড়ে মনে (পর্ব-৪)



লেখক, মো. শহীদুল্লাহ

নড়াইলের চিত্রা নদীর তখন ভরা যৌবন ছিলো। এই চিত্রা নদী পাড়েই কুড়িগ্রামে ইতিহাস বিখ্যাত চিত্রকর এস এম সুলতানের বাড়ি। এস এম সুলতানের বাড়ির পাশে নড়াইলের বিখ্যাত জমিদার বাড়ি। অনন্ত যৌবনা চিত্রা নদীর বুক চিরে তখন কল রবে জলধারা বয়ে যেত। আমার মাতুলালয় ছিল তখনকার বৃহত্তর নড়াইল মহাকুমার নড়াইল সদর থানার মির্জাপুর গ্রামে। মাতুলালয়ের এই গ্রামটি নানান দিক থেকে ঐতিহ্যবাহী ছিল। আমার মাতামহ কাতেবুর রহমান মুন্সি মির্জাপুর গ্রামের নাম করা মানুষ ছিলেন, এক নামেই সবাই তাকে চিনতেন। স্রোতস্বিনী চিত্রা নদীর বুক দিয়ে তখন ইঞ্জিন চালিত বড় লঞ্চ নড়াইল ডিসি অফিসের ঘাট থেকে খুলনা পর্যন্ত যেত। মা মাঝে মাঝেই তার নিজের বাড়িতে আমাদেরদের ভাইবোন-সহ বেড়াতে যেতো। নানা বাড়ি পৌঁছাতে হলে নড়াইল শহর থেকে লঞ্চে সিংগাশোলপুর লঞ্চঘাট-তারপর সেখান থেকে ভ্যানে নানা বাড়ি গেলে কতই না মজা, পিঠেপুলি আর পায়েস খাওয়ার ধুম; এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো কত না মজার ব্যাপার। ডিসি অফিসের লঞ্চঘাট থেকে দোতালা লঞ্চে উঠার পর যখন লঞ্চ ঘাট থেকে ছেড়ে দিত তখন দোতলায় যেয়ে বসতাম তখন লঞ্চ নদীর ঢেউয়ের সাথে বোঝাপড়া করে যখন সামনে এগোতো তখন লঞ্চের দুলুনিতে ঘুম ঘুম ভাব এসে যেত। লঞ্চে বসে নদীর দু’পাড়ের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য দুচোখ ভরে দেখে নয়ন সার্থক হতো। ঢেউয়ের আঘাতে যখন নদীর পাড় ভেঙে ভেঙ্গে পড়তো তখন মনো বীণার তারে তারে ঝংকৃত হতো ‘নদীর একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে এইতো নদীর খেলা।’ নদীপথে নানা বাড়ি যাওয়ার পথে হাটবাড়িয়ার জমিদারবাড়ির জীর্ণশীর্ণ বিল্ডিং চোখে পড়ত। যাত্রীদের অনেকেই বলতো এই জমিদার অনেক অত্যাচারী ছিল, খাজনার টাকা আদায় করতে তিনি তার প্রজাদের অনেক জুলুম নির্যাতন করেছেন। নানা বাড়ি পৌঁছে নানীর কাছে বসে রাতে অনেক গল্প শুনতাম। সেই আমলে কোন টেলিভিশনের অস্তিত্ব নানিবাড়িতে পাইনি, তবে নানি বাড়িতে একটা বড় রেডিও ছিল। গ্রামের সবাই নানিবাড়ির ঘরের বারান্দায় হোগলা পাতার চাটায় পেড়ে রেডিওর খবর আর গান শুনতো। আমি নানা বাড়ির পুকুরে সারাদিন সাঁতার কেটে সময় উপভোগ করতাম৷ মা মাঝে মাঝে এসে বলতেন বাবা পুকুর থেকে উঠ ঠান্ডা লেগে জ্বর হয়ে যাবে। আমি বলতাম এই উঠছি মা বলার পরেও ঘন্টা কেটে যেত৷ তারপর গোসল সেরে খালার দেওয়া মাটির বাসনে মুলোর সাথে শিং মাছের ঝোলের আর চুই ঝালের তরকারির সেই অমৃত স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। বিকেলে বুলু মামার সাথে মির্জাপুর হাটে যেতাম। রবি বৃহস্পতিবারে মির্জাপুরের হাট। হাটে গ্রামের খাল বিল থেকে ধরে আনা যেসব ছোট ছোট মাছ উঠতো মামা তাই কিনে আনতেন। রাতে আমি যে ঘরে শুতাম সে ঘর থেকে দূরের কোন বাড়ির তাঁতের খট খট আওয়াজ কানে এসে বাজত যা শুনতে খুবই ভালো লাগতো। মামার কাছে শুনেছি মামা বাড়িতে আসার পথে দু’ধারের অনেক বাড়িতে হাতে টানা তাঁত আছে। যাতে তাঁতিরা লুঙ্গি গামছা ইত্যাদি বানাতো। নানিবাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণ ছিল বাড়ির সামনের আঙ্গিনায় চুলো বানিয়ে সেখানে হাঁড়িতে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করা। কি ভাবে গুড় তৈরি করে তা বসে বসে দেখতাম। নানিবাড়ির যে ঘরে আমি ঘুমোতাম তার পঞ্চাশ গজ ওপাশেই বাঁশবাগানের ঝাড়। সেখানে রাতে চাঁদের আলোর সম্মেলনে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হতো। জানালার ফাঁক দিয়ে বাঁশের ঝাড়ের পাতার ফাঁকে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে যেতো কাজলা দিদি কবিতারা সেই পংক্তিমালা ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ, মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? পুকুর পাড়ে লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই; মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কৈ? গভীর রাতে যখন কুহু পাখি ডেকে উঠতো তখন মনে হতো সত্যিই যেন আমি বেহেস্তে শুয়ে আছি। জানালার ফাঁক দিয়ে জোনাকির মিট মিট আলো দেখে দেখে যখন আমার ঘুম আসতো না তখন যেন জোনাকি রানী আমার কানের কাছে মুখ লুকিয়ে আমাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য কানে কানে বলতো ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে? ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কি? আর কটা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *