থানা আপনার মামলা গ্রহণে আইনত বাধ্য!


এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

থানায় কিভাবে কেস করবেন, কেস লেখার নিয়মাবলী কি, থানায় কোনো কারনে মামলা না নিলে কি করবেন আর মামলা নিতে বাধ্য করতে যে কাজগুলো আপনাকে জানতে হবে-সেসব বিষয়ে জানুন আইনী আলোচনা।

প্রথমেই জেনে নিই এজাহার বা কেস কি। কোনো অপরাধের বিস্তারিত বিবরণসহ শাস্তি দাবী করে বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে থানায় অপরাধের সংবাদ লিপিবদ্ধ করাকে এজাহার বলে। যা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা নামেও পরিচিত। অপরাধ সম্বন্ধে এ বিবরণ প্রথম দেয়া হয় বলে একে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বলে। আমলযোগ্য অপরাধ (ঈড়মহরুধনষব ড়ভভবহপব) হচ্ছে সেই অপরাধ যে অপরাধের দরুণ অভিযুক্তকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যায়। এজাহার লিখিত বা মৌখিক যে কোনভাবেই করা যেতে পারে। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় এজাহার সম্পর্কে বলা হয়েছে, মৌখিক এজাহার দিলে থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিনামূল্যে ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে দিবেন এবং উক্ত ঘটনার বিবরণ তিনি তথ্য প্রদানকারীকে পড়ে শুনিয়ে আপত্তি না থাকলে তাতে তার স্বাক্ষর নিবেন। আর যদি তথ্য প্রদানকারী কোন সংশোধন আনতে চান তবে তা আনার পর স্বাক্ষর নিবেন। এই তথ্য বিবরণী উক্ত অফিসার সরকার কর্তৃক নির্দেশিত (বিপি ২৭) ফরমে লিপিবদ্ধ করবেন। অন্যদিকে লিখিত এজাহারের বেলায় সংঘটিত অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ স্বাক্ষরসহ দরখাস্ত আকারে সংশ্লিষ্ট থানায় দাখিল করতে হয়। তবে কোন কারণে থানা এজাহার নিতে না চাইলে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে নালিশি (ঈড়সঢ়ষধরহঃ জবমরংঃবৎ) মামলা রুজু করা যায়। যেকোন ব্যক্তিই অপরাধ সংঘটন স্থলের নিকটবর্তী থানায় এজাহার রুজু করতে পারেন। এর জন্য তাকে ক্ষতিগ্রস্থ হবার প্রয়োজন নেই। তবে আমল-অযোগ্য অপরাধের ঘটনা তদন্ত করতে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্বানুমতির প্রয়োজন পড়ে, যা রাষ্ট্র বনাম আবদুল গফফার মুন্সী এবং অন্যান্য, ৩৫ তম ঢাকা ল’ রিপোর্টের ৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে। এখন আমরা জেনে নিই এজাহারে যে সকল বিষয় উল্লেখ করতে হবে। ঠিকমতো এজাহার লিখতে বা করতে না পারায় অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে দালালদের সাহায্য নেন। কিন্তু দালাল তো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী না হওয়ায় এজাহারে এ সকল ঘটনার প্রকৃত বিবরণ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়। ফলস্বরূপ এজাহার দুর্বল হয়ে যায় এবং আসামির বিপক্ষে মামলা প্রমান করা কঠিন হয়ে পড়ে। এজাহার হলো ফৌজদারি মামলার ভিত্তি, তাই এজাহারে অপরাধী ও অপরাধের ঘটনার বিবরণ সতর্কতার সঙ্গে তুলে ধরতে হয়। এজাহারে (১) সুস্পষ্টভাবে অপরাধীর নাম ও ঠিকানা (জানা থাকলে) উল্লেখ করা; (২) অপরাধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা যৌক্তিকভাবে লিপিবদ্ধ করা; (৩) অপরাধ সংঘটনের তারিখ ও সময় উল্লেখ করা; (৪) অপরাধের সংঘটনস্থল উল্লেখ করা; (৫) অপরাধ সংঘটনের কোন পূর্ব সূত্র বা কারণ থেকে থাকলে তার বর্ণনা তুলে ধরা; (৬) সন্ধিগ্ধ ব্যক্তিদের সম্পর্কে ধারণা দেয়া; (৭) অপরাধ পরবর্তী অবস্থা যেমন -সাক্ষীদের আগমন, আহত ব্যক্তির চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা; (৮) সাক্ষীদের নাম, ঠিকানা ইত্যাদি উল্লেখ করা; (৯) অপরাধীদের কেউ বাধা দিয়ে থাকলে তার ধারাবাহিক বর্ণনা করা; (১০) কোন বিষয় তাৎক্ষনিকভাবে লেখা সম্ভব না হলে পরবর্তীতে সে বিষয়টি সংযোজন করা হবে এমন একটি কৈফিয়ত কলাম উল্লেখ করা জরুরি। এছাড়া এজাহার দাখিলে কোন কারণে বিলম্ব হলে যথাযথ ও যৌক্তিক কারণ দর্শানো এবং কোন ঘষা-মাজা, কাটা-কাটি করা না থাকা ভাল। যদিও ফৌজদারি অপরাধের কোন তামাদি নেই, তথাপি এজাহার দায়েরে বিলম্ব মামলার গুনগতমান বিনষ্ট করে। এখন জানার বিষয় এজাহার রুজুর পর পুলিশি দায়িত্ব। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি), ১৯৪৩ এর ২৪৩, ২৪৩(চ) ও ২৪৫ প্রবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধির, ১৮৯৮’র ১৫৪ ধারানুযায়ীঃ আমলযোগ্য অপরাধের সংবাদ শুনে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার ঋওজ গ্রহণ হতে বিরত থাকতে পারবেন না। এজাহার হলো জিআর (এবহবৎধষ ৎবমরংঃবৎ) বা পুলিশি মামলার মূল ভিত্তি। অপরাধ সংঘটনের সংবাদটি কোন আমলযোগ্য ঘটনার না হলে সেটি জিডি হিসেবে এন্টি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ম্যাজিস্ট্রেট আমলযোগ্য কোন অপরাধ তদন্ত করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিলে ম্যাজিস্ট্রেটের প্রেরিত লিখিত বার্তাই পুলিশ কর্মকর্তা এজাহার রূপে গণ্য করে পদক্ষেপ নিবেন। এ বিষয়ে ৪৭তম ঢাকা ল’ রিপোর্টের ৯৪ পৃষ্ঠায় উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে। এবার জেনে নিই জিডি ও এজাহারের পার্থক্য সম্পর্কে। জিডি করা হয় অপরাধ সংঘটনের আশংকা থেকে, অপরদিকে এজাহার করতে হয় অপরাধ সংঘটনের পরপর। এজাহার কেবলমাত্র আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রেই দায়ের করা যায়, কিন্তু জিডি যেকোন অপরাধ এমনকি কোন কিছু হারিয়ে গেলেও করা যায়। আর এজাহার করার সময় মনে রাখবেন, একই এজাহারের তিনটি কপি করবেন আপনি। তিনটি কপির দুটি কপি থানায় কর্তব্যরত ডিউটি অফিসারকে দেবেন এবং অবশিষ্ট কপিতে অবশ্যই গৃহীত ব্যক্তির স্বাক্ষরসহ এজাহারের কপি দাবি করে গ্রহণ করতে পারবেন। এবার আমরা জেনে নিই থানা পুলিশের এজাহার গ্রহণ বাধ্যতামূলক সম্পর্কে। থানায় কোন অভিযোগকারী ব্যক্তি অভিযোগ দায়ের করলে তা প্রত্যাখ্যান করার এখতিয়ার আমাদের দেশের বিদ্যমান ও বর্তমান কোন আইনে নেই। পুলিশ স্টেশন বা থানায় মামলা বা অভিযোগ দায়েরের কথা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় উল্লেখ থাকলেও পুলিশ বাহিনীর বাইবেল বলে পরিচিত পুলিশ রেগুলেশন্স বেঙ্গল- ১৯৪৩ (পি আর বি)-এর ২৪৪ নম্বর প্রবিধানে অভিযোগ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। পিআরবি-এর ২৪৪ (ক) প্রবিধানে পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে- ‘অ ভরৎংঃ রহভড়ৎসধঃরড়হ ংযধষষ নব ৎবপড়ৎফবফ রহ ৎবংঢ়বপঃ ড়ভ বাবৎু পড়মহরুধনষব পড়সঢ়ষধরহঃ ঢ়ৎবভবৎৎবফ নবভড়ৎব ঃযব ঢ়ড়ষরপব যিবঃযবৎ ঢ়ৎরসধ-ভধপরব ভধষংব ড়ৎ ঃৎঁব, যিবঃযবৎ ংবৎরড়ঁং ড়ভ ঢ়বঃঃু, যিবঃযবৎ ৎবষধঃরাব ঃড় ধহ ড়ভভবহপব ঢ়ঁহরংযধনষব ঁহফবৎ ঃযব ঢ়বহধষ পড়ফব ড়ৎ ধহু ংঢ়বপরধষ ড়ৎ ষড়পধষ ষধ.ি..’ অর্থাৎ আমলযোগ্য প্রত্যেক অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের সামনে প্রদত্ত প্রথম তথ্য রেকর্ড করতে হবে সেটা প্রাথমিকভাবে সত্য হোক বা মিথ্যা হোক কিংবা গুরুতর হোক বা ক্ষুদ্র হোক অথবা দ-বিধি বা অন্য কোন স্পেশাল বা আঞ্চলিক আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য যাহাই হোক না কেন। পিআরবি এর এই প্রবিধানে মামলা গ্রহণ বা রেকর্ড করার বাধ্যবাধকতায় শব্দ দঝযধষষ’ ব্যবহার করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে থানায় যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে কেউ মামলা করতে পারবে কি-না? উত্তর হলো হ্যাঁ। তাহলে আবারও প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এভাবে মামলা হলে অগণিত মামলা হবে কি-না? এর উত্তরে বলা যায় অগণিত মামলা হবে সাধারণ দৃষ্টিতে। কিন্তু গভীর দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, যে কোন তথ্য মামলা হিসেবে রেকর্ড করার কথা আইনে বলা হলেও সব মামলার তদন্ত নাও হতে পারে। কারণ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৭ (১) (গ) ধারায় বলা হয়েছে যে, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে যদি এটা প্রতীয়মান হয় যে, মামলাটির পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই, তাহলে তিনি মামলাটির তদন্ত করবেন না। আবার দ-বিধিতে উল্লেখিত ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের পাল্টা ব্যবস্থা রাখার ফলে থানায় মামলা রেকর্ড করার সুবিধাটিকে পযবয়ঁব ধহফ নধষধহপব করা হয়েছে। এবার আমরা জেনে নিই থানায় মামলা না নেয়ায় পুরিশ অফিসারের বিরুদ্ধে যে শাস্তি হতে পারে তা পুলিশ আইন ১৮৬১ এর ২৯ নম্বর ধারায় পরিস্কারভাবে উল্লেখ আছে। সেখানে বলা আছে, কোন পুলিশ কর্মচারী যদি কোন নিয়ম বা রেগুলেশন স্বেচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য করে বা গাফিলতি এবং পূর্ণভাবে তা পালনে শৈথিল্য করা; তবে তাকে বিচারার্থে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সোপর্দ করা চলবে এবং বিচারে অপরাধী প্রমাণিত হলে ৩ মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা অথবা তিন মাস পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ- অথবা উভয়বিধ দ- হতে পারে। আইনের এই বিধান মামলা না নেয়ার অপরাধকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে রোধ করার ব্যবস্থা করেছে। এখানে নিয়ম (জঁষব) বা রেগুলেশন লংঘন বা গাফিলতি বলতে পিআরবি-এর মামলা গ্রহণ সংক্রান্ত ২৪৪ নিয়মের লংঘনকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ থানায় পুলিশ মামলা গ্রহণ করেননি, এটা প্রমানিত হলে তার উপরোক্ত শাস্তি হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *