নদীর কান্না পলিভরণ বনের কান্না জীবনদাহে



॥ গৌতম কুমার রায় ॥

এক সময়ের বাংলাদেশ জলময় ছিল। নদী, বিল,ঝিল, পুকুর, দীঘি, ডোবা, হাওড়, বাওড়, সাগর,মোহনা জড়িয়ে এই দেশের জন্ম। আবার এই জলকে নিয়ে এখানে সৃষ্টি হয়েছিল মানুষের বসতি ও জীবনযাত্রা। বছরের একটা সময়ে জলের আধার। আবার আরেকটা সময়ে জল শূন্যতা। এখানে এসে মানুষ দেখলো জলে ফল আসে। ফসল হয়। তবে জল বিনে কোন খাবার আসে না। তাহলে সারা বছর কিভাবে জলকে ধরে রেখে জলের ব্যবহারে ফল বা ফসল উৎপাদন করা যায়। সেই থেকে মাথায় আসে আঁইল করে জলকে বাঁধে আবদ্ধ রেখে বসবাস এবং তার ব্যবহারের চিন্তা। তাও প্রায় ৫০০০ বছর আগের কথা। চৈনিক কথায় তাই এই বাঁধের জীবন চলকে যে মানুষেরা তাদের সমাজ ও পরিবেশ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিল তাদেরকে এরা বলে বাঙালি। অর্থাৎ বঙ্গ + আইল=বঙ্গাইল = বাঙালি। বাঙালির পরিচয়ে সে দিন যুক্ত হয়েছিল খাল, বিল, নদী আর জলের রেখা। বাংলাদেশ এবং বাঙালির পরিচয়ে স্বতন্ত্র উপাদান হলো জল। তা উজানের পাহাড়ী হোক কিংবা সাগর ও মোহনার হোক, জলের সাথে মানুষ আর মাটির সম্পর্ক জন্ম থেকেই। যে জন্য মনে করা হয় জল না থাকলে মাটি বা বাংলাদেশ থাকবে না।
একটি পরিসংখ্যানে আছে, এখন দেশে ৩১০ টি নদী আছে। যার মধ্যে নাকি ১১৭ টি নদী মৃতপ্রায়। তবে পরিসংখ্যান আর যাই বলুক আমাদের দেশে যে ৮০০ বা তার চেয়েও ঢের নদীর দেশ ছিল তা কিন্তু সত্য। আবার পুরো দেশটাও এক দিন জলরাশি ছিল। মনে হয়, বেশি দূরে নয় মাত্র ৫০০ বছর আগে তাকালেই দেখা যাবে আমাদের নদী কত ছিল, মানুষ কত হারে জন্মেছে, আবার এই নদী কত দ্রুত হারিয়েও গেছে। পাহাড়ের বন নেই, ঢলে কত কত পলি ভেসে এসে নদীতে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। চরের পর চর তৈরীতে নদীকে শেষ করে দিয়েছে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর দেশের নদী পথে ২৫০ কোটি মেট্রিক টন পলি বয়ে আসে যা আমাদের নদী এবং সাগর মোহনাকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করেছে।
পরিবেশ এবং প্রতিবেশ। আজ দুটোই আমাদের দেশে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং প্রকৃতিকে মানুষের যে ইচ্ছে মাফিক ব্যবহার তাতে প্রকৃতি মানুষের উপরে রুষ্ট। যে জন্য আমাদের জলবায়ু মরুকরণের দিকে এগিয়েছে। অতিবন্যা, খাদ্যাভাব, দারিদ্রতা। প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে পতিত হওয়া। প্রকারান্তে আমরা বাস্তুচ্যুত হয়ে পরছি এবং অভাবী জীবনে এগিয়ে চলেছি। আমরা আবহাওয়ার আক্রোশে পরেছি। বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা আমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। প্রতি ১০ বছর পর পর আমাদের তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়ছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বছরে আমাদের স্বাভাবিক বৃষ্টি কমছে অন্তত ১ মিলি মিটার হারে। মিষ্টি জলের যে আকাল তা গিয়ে ঠেকেছে উৎপাদনেও এবং আমাদের প্রাত্যহিক জীবন যাত্রায়। যদি কৃষির কথা বলি। তা এখন পুরোপুরি সেচ নির্ভর হয়ে গেছে। ভাবা যায় ১ কেজি মাংশ তৈরীতে ১৫০০০ লিটার জল প্রয়োজন, আবার ১ কেজি ধান উৎপাদনে লাগে ৩৫০০ লিটার জল। মানুষের মুখ এবং চাহিদাতে উৎপাদন প্রতিযোগিতায় জলের যে শূন্যতা এসে গেছে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে এই নদী-নালা, জলরাশির কোন বিকল্প আর নেই। অথচ তা আজ লবণের আগ্রাষণে আর পলিভরণে আক্রান্ত। যদি ভূগর্ভস্থ জল স্তরের কথা বলি তাও আজ সাবলিলতায় নেই। মাটির পরে অবকাঠামো তৈরী করতে গিয়ে জলস্তরে শূন্যতায় পূর্ণতা পাচ্ছে না। পর্যাপ্ত বৃষ্টি যেমন নেই, আবার নেই বন্যার মত জল সরবরাহ। যেখানে জমি কমছে অথচ গভীর নলকূপ বাড়ছেই। যদি ৮ লাখ নলকূপ হলে চলে, সেখানে এখন নলকূপ রয়েছে প্রায় ১৪ লাখেরও বেশি। নীচ থেকে জল যে হারে উঠছৈ, সে হারে পূর্ণতা পাচ্ছে না। প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে জল নিয়ে সংঘাত এবং তা থেকে মৃত্যুর খবর এখন নিয়মিত সংবাদের বিষয় হয়ে গেছে। নদী এবং তার জল প্রাপ্যতায় উজানের দেশের সাথে ভাটির দেশের ব্যবধান বাড়ছেই। প্রকৃতির এই জায়গায় মানুষের অধিকারে ব্যত্যয় ঘটেছে। নিরাপদ পানির বিষয় দিন দিন মানুষ এবং জীবকূলকে ভাবিয়ে তুলেছে। মানুষ নিরাপদ জলের ব্যবহার থেকে বেশি বেশি বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রকৃতি বাহিত জল এবং তার উপর নির্ভর বন ও বন নির্ভর জীবকূলের নির্ভরতার একটি সমীক্ষা ঃ-
দেশের একটি অঞ্চল জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে পদ্মা নদী। মাগঙ্গা হতে জন্ম নিয়ে পদ্মা নদী নিজেও জন্ম দিয়েছে অনেক নদী। তবে একথা সত্য, নদীর ধর্ম হলো নিজের আগে তার জন্ম দেওয়া সন্তান নদীর মৃত্যু দেখে যেতে পারে। যেমন মা পদ্মা দেখেছে কেমন করে শীর্ণ জীবনে পৌছে গেছে মেয়ে হিসনা, চন্দনা, মাথা ভাঙ্গা এবং কুমার নদীা। আবার গৌড়ি বা গড়াই নদীর আগেই মরেছে মেয়ে ডাকুয়া আর কালি কিংবা নবগঙ্গা নদী। দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের হৃদপিন্ড হলো গড়াই নদী। কিন্তু সুন্দরবন ! আমাদের দেশের প্রকৃতিক দূর্যোগে মানব রক্ষার ঢাল হলো এই সুন্দরবন। যা আমাদের জন্য অক্সিজেন চেম্বার নামে খ্যাত। অর্থাৎ ফুসফুসের সাথে তার রয়েছে অভেদ্য সম্পর্ক। নদীর জন্য বন আবার বনের জন্য জীবন পরিবেশ সমাজ। পরস্পর পরস্পরের সাথে করে চলে। সুন্দরবনের সমস্যা হলো লবণাক্ততা। আর নদীর সমস্যা হলো পলির আবরণ। যা থেকে নদীতে জন্ম হয় বালুর টিউমার। আর এই চরের কারণে বর্ষায় নদীর পেট ফুলে প্লাবিত হয় বিস্তৃর্ণ এলাকা। ভাঙন আর ¯্রােতে বিছিন্ন হয় মানবতা। আবার বনের বিপর্যয়ে প্রাণিকূল ধ্বংস হয়। অতি লবণের কারণে ধ্বংস হয় জলের প্রায় ২১৪ প্রজাতির মহামূল্যবান প্রাণ। মাছ, বন, গাছ, পশুপাখি হারায় তাদের আশ্রয়স্থল। দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলে মিষ্টি জলের একমাত্র উৎসস্থল হলো এই গড়াই নদী। যার জলপ্রবাহে সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকার গাঢ় লবণাক্ততা ভেঙে হালকা হলে বন সৃজন যেমন হয়। তেমনি মাছসহ জলজ প্রাণি টিকে থাকতে পারে। এ থেকে বন-বৃক্ষ,গুল্ম-লতা,কীট-পতঙ্গ, পশু-পাখি টিকে থাকতে পারে তাদের প্রয়োজনীয় জল ও খাদ্য খাবার পেয়ে। আর এ থেকে টিকে থাকে মানুষও। গড়াই নদীতে প্রতি বছর উৎস মুখ হতে প্রায় ৪১ কিলোমিটার ভাটি পথে প্রচুর পলি পরে। যেজন্য শুষ্ক সময়ে নদীর কোন জলপ্রবাহ থাকে না।মিষ্টি জলের এই যোগান না পেয়ে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল ও পিরোজপুরসহ অনেক এলাকায় লবণের ঘনত্ব বেড়ে যায়। ভূ-পরিস্থ জলের এই লবণ বেশি হওয়ায় পরিবেশ ক্ষতির সম্মুখিন হয়। গড়াই নদী ও সুন্দরবন সমস্যার শুরুটা ঠিক ১৯৭৫ সালের পর থেকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভগবানগোলাতে গঙ্গানদীর জল ভাগিরথী এবং হুগলি নদীতে সরিয়ে নিতে যে ফারাক্কা বাঁধ তৈরী করা হয় তার আগে আমাদের দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলের মোহনাগুলোতে লবণাক্ততার যে আদর্শ মাত্রা ছিল, তার শৃঙ্খল এ সময়ে এসে ভেঙে পরলে শুরু হয় বিপর্যয়। বাঁধ তৈরী হওয়ার পরে হুগলী নদীতে গঙ্গা হতে প্রতি সেকেন্ডে ১১৩৪ ঘনমিটার জল প্রত্যাহার করায় গঙ্গার জল প্রবাহ মাত্রা প্রতি সেকেন্ডে ৩১১৪ ঘনমিটার হতে ২০১০ ঘনমিটারে এসে দাঁড়ায়। এই জলপ্রবাহে বাধা আসায় ২০০৮ সালে বিশেষকরে শুষ্ক মৌসুমে গড়াই নদীর প্রবাহ দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১০ ঘনমিটার। এখন গড়াই নদীর উৎস হতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভাটিপথে পানিউন্নয়ন বোর্ড একটি জলের চ্যানেল কোন রকম সচল রাখতে ২০১৮-২০২২ সাল মেয়াদে ফি বছর ড্রেজিং কার্যক্রম এবং ভাঙনরোধ ও ভাটি এলাকার পরিবেশ এবং প্রতিবেশ সমুন্নত রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। এই কাজের মুল উদ্দেশ্য হলো পরিবেশগত বিপর্যয় হতে সুন্দরবনকে রক্ষা করা। নৌচলাচল এলাকা বৃদ্ধিকরা। পদ্মা নদী হতে গড়াই নদীতে জলপ্রবাহ বাড়ানো। খুলনা এলাকার ভূপরিস্থ লবণ জলের মাত্রা কমপক্ষে ৫ পিপিটি কমিয়ে আনা। এখানকার নোনা জলে মিষ্টি জলের মাত্রা মিশিয়ে তা কৃষি ও নিয়মিত জনজীবনে ব্যবহার যোগ্য করে তোলা। ফারাক্কা বাঁধ হলে খুলনার শিব্সা নদীতে মিষ্টি জলের প্রবাহ প্রায় ৬০ শতকরা কমে আসে। শিব্সা নদী, পশুর নদী, খুলনা নদী হতে প্রায় ২৩ কিলোমিটার ভাটিতে চালনা’র চুনখুরী এবং পানখালী খালের সাথে যুক্ত। শুষ্ক সময়ে পশুর নদীর জলের উচ্চতা জোয়ার-ভাটার জন্য শিব্সা নদীর জলের উচ্চতা বেশি হয়। যে জন্য এই মৌসুমে হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ শিব্সা নদী হতে পশুর নদীতৈ সক্রিয় হওয়ায় চুনখুরী খাল দিয়ে উচ্চমাত্রার লবণ জল পশুর নদীতে প্রবেশ করে। যে জন্য চালনা পয়েন্টে সল্ট প্লাগ অবস্থায় রূপ নেয়। (সূত্রঃ দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত জার্ণাল ‘ সাইন্টিফিক রিপোর্টস এ গত ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন প্রকাশিত দীনেশ চন্দ্র সাহা এবং ইয়াং কি চো’র ‘ সল্ট প্লাগ ফরমেশন কস্ড বাই ডিক্রিজ্স্ড রিভার ডিসচার্জ ইন এ মাল্টি চ্যানেল ইস্টুয়ারি শিরোনামের গবেষণা প্রবন্ধ)।’ সল্ট প্লাগ হলো মিষ্টি জলের অভাবে একটি নির্দৃষ্ট অবস্থানে মাত্রাতিরিক্ত মোটা লবণ কণা এবং ঘন নুনের আস্তরণ মিশ্রিত জল। এই সল্ট প্লাগ শুষ্ক সময়ে পশুর নদীর জয়মণি হতে বটিয়াঘাটা পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা বিস্তৃত হয়। এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ৬ মাস বা তার চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করে। সল্ট প্লাগ জলজ ইকোসিস্টেমের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিও বটে ! গবেষণা নিবন্ধ আরো বলছে, সল্ট প্লাগের কারণে পশুর নদীর জল প্রবাহের সাথে সাগরের জলপ্রবাহে সংযুক্তি ঘটতে বাধা পায়। ফলে নদী তীরবর্তী শিল্পের বর্জ্য এবয় বিশাল বনের ডেটট্রাইটাস সহ সকল জৈব এবং অজৈব পদার্থ ঘনীভূত সংযুক্তিতে বসবাসকারী সখল জীবের টিকে থাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়। এজন্য এখানে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায়। এমন কি বিষাক্ত জলপ্রবাহ উজানে এগিয়ে আসে জোয়ারের সময়ে। ফলে জলের লবণাক্ততা উজানমুখী হয়ে ভূগর্ভস্থ ও ভূনি¤œস্থ সুপেয় জলের স্তরকে বিষাক্ত করে। ৩০ মার্চ-২০১৪ খ্রিস্টাব্দের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ইতোমধ্যে এই ধারাবাহিকতায় নড়াইল জেলার লৌহগড়া উপজেলা পর্যন্ত মধুমতির জলে অর্থাৎ পশুর নদীর উজানে ০.২ পিপিটি লবণের উপস্থিতি। নিবন্ধে দাবী করা হয়েছে এই কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মংলা এলাকা সংলগ্ন সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের যে আগা মরে গিয়েছিল এটা তার কারণে। বিশেষ করে মোহনা সংলগ্ন নদী-খালের জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের ধারাবাহিকতায়ও অসামঞ্জস্যতা লক্ষ করা গেছে। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি, এই সল্ট প্লাগের জন্য জল এবং তার জন্য বনের ইকোসিস্টেমে বসবাসকারী জীবের জীবন অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর একমাত্র মিষ্টি জলের প্রবাহ এই গড়াই নদীকে সচল রাখা না গেলে নদীর পরিবেশ এবং প্রতিবেশ যেমন হুমকিতে আবার এ জন্য পৃথিবীর ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সুন্দরবন টিকে থাকার বিষয়টি ঝুঁকিযুক্ত।
ঈলিতে নদী মরে-লবণে মরে বন। বনের কারণে অস্তিত্ব হারায় বনের জীবন। শুষ্ক মৌসুমে যে জন্য পদ্মার জলের উচ্চতা বাড়িয়ে গড়াই নদীকে সচল রাখা দরকার। এতে নদী বাঁচবে,বাঁচবে বনের জীবন, আর বাঁচবো আমরাও।
—– লেখক: গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *