প্রকাশ্যে স্ত্রী,সন্তান ও এক যুবককে গুলি করে হত্যা


পরকীয়া প্রেমের জের ধরে হত্যা, থানায় মামলা দায়ের

বিশেষ প্রতিবেদক

কুষ্টিয়ায় প্রকাশ্যে স্ত্রী, সৎ শিশু সন্তান ও এক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে এক এএসআই। পরকীয়া প্রেম বা কথিত বিয়ের সম্পর্কের জের ধরেই এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় পুলিশ সৌমেন রায় নামে ঐ এএসআইকে আটক করেছে। তিনি খুলনার ফুলতলা থানায় কর্মরত ছিলেন বলে ওই থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহতাব উদ্দিন জানিয়েছেন।

রবিবার বেলা ১টায় শহরের কাস্টমস মোড়ে ডা. আজাদুর রহমানের মার্কেটে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন, কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের সাঁওতা কারিগর পাড়ার মেজবাউল রহমানের ছেলে শাকিল খান(২৮), একই উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের ভবানিপুর গ্রামের আমির আলীর মেয়ে আসমা খাতুন(৩০) ও নিহত আসমার আগের পক্ষের ছয় বছরের শিশু সন্তান রবিন।

শাকিল বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর সেলস অফিসার পদে চাকরি করতেন। নিহত নারী সৌমেনের দ্বিতীয় স্ত্রী। এদিকে ছেলে হত্যার ঘটনায় নিহত শাকিলের বাবা মেজবাউল রহমান বাদী হয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী রাসেল জানান, রবিবার বেলা ১১টার সময় কাস্টম মোড়ের ডা. আজাদুর রহমানের নিচতলার মার্কেটের ভেতর থেকে গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় কয়েকশ’ লোক জড়ো হয়ে সেখানে যান। এসময় তারা মার্কেটের মেঝেতে এক নারী ও পুরুষের এবং মার্কেটের সামনে একটি শিশুকে রক্তাক্ত অবস্থায় নিথরভাবে পড়ে থাকতে দেখেন। আর এসময় সেখানে অস্ত্রধারী এক যুবক তাদের রিভলবার উঁচু করে গুলি করার ভয় দেখান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকশ’ লোক ওই যুবককে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়লে তিনি হাতের অস্ত্র ফেলে দেন। পরে তাকে মার্কেটের মধ্যে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেন তারা।
রাস্তার বিপরীত পাশের চা দোকানি বলেন, হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি, মার্কেটের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট শিশু ছুটে বের হলো, ওর পেছনে পিস্তল ধরা লোকটি ছুটে এসে শিশুটিকে ধরে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করলো। তখনই শিশুটি মাটিতে পড়ে যায়। প্রকাশ্যে শিশুটিকে যেভাবে গুলি করলো, তাতে মনে হলো কতই না রাগ বাচ্চাটার ওপর।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি সাব্বিরুল ইসলাম জানান, গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন আসমা নামের ওই নারী। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তার সঙ্গে থাকা যুবক ও শিশুটিকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় নিহত শাকিলের বাবা মেজবাউল রহমান বাদী হয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) তাপস কুমার সরকার বলেন, হাসপাতালে আনার পর ওই ব্যক্তি ও শিশুটির মৃত্যু হয়।
স্থানীয় এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মীর রেজাউল ইসলাম বাবু বলেন, যাদের হত্যা করা হয়েছে, তারা বহিরাগত। গুলিবর্ষণকারী হিসেবে যাকে আটক করা হয়েছে, তাকেও চিনতে পারিনি।
নিহত আসমা খাতুনের মা হাসিনা বেগম বলেন, পাঁচ বছর আগে তাদের বিবাহ হয়। রবিবার সকালে আসমা তার আগের পক্ষের ছেলেকে নিয়ে কুমারখালীর বাগুলাট ইউনিয়নের নাতুরিয়া গ্রামে তার নানা বাড়িতে গিয়েছিল। জানতে পেরেছি সেখান থেকে সৌমেন তাকে খুলনায় নিয়ে যাবে বলে ফোন করে কাস্টম মোড়ে ডেকে নেই। শুনেছি সে সময় শাকিলকেও নাকি ফোন করে একই স্থানে ডেকে নেই। শাকিল বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, তাঁর মেয়ের সঙ্গে শাকিল ফোনে কথা বলতেন।
নিহত আসমার কিশোর ভাই হাসান বলেন, শাকিলের সাথে মোবাইলে আসমার কথাবার্তা হতো বলে জানতে পেরেছিলাম। এই নিয়ে আমার বোনের সাথেও সৌমেনের কথাকাটাকাটি হয়। প্রায় সৌমেন আমার বোনকে নির্যাতন করতো।
এদিকে নিহত শাকিলের ভাবি শারমিন আক্তার বলেন, এক মাস আগেও সৌমেন নামে ঐ পুলিশ আমাদের বাড়িতে এসেছিল। তিনি সে সময় শাকিলকে আসমার সাথে যোগাযোগ না করার জন্য জানান। আমরা পরিবারের সবাই জানতাম আসমার সাথে শাকিলের পাতানো ভাই বোনের সম্পর্ক ছিল। এর বেশি আমরা কিছুই জানি না। তাছাড়া আসমাকেও আমরা তেমন ভাবে চিনি না।
নিহত শাকিলের বাড়ি চাপড়া ইউনিয়নের সাঁওতা কারিগর পাড়ার এলাকাবাসীর সাথে কথা হলে তারা জানান,এর আগে শাকিলের সাথে তার খালোতা বোনের সম্পর্ক ছিল। দুই বছর আগে খালাতো বোনকে বিয়ে না করায় সে গলায় দঁড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে।নিহত আসমার নানী বাড়ি বাগুলাট ইউনিয়নের নাতুরিয়া গ্রাম ঘুরে গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর আসমা খাতুন তার মায়ের সাথে কুষ্টিয়া শহরের বাবার আলী গেটে থাকতেন। এর আগে তার দুইবার বিয়ে হয়েছিল। প্রায় ১০ বছর পূর্বে ইউনিয়নের ভড়ুয়াপাড়া গ্রামের ওয়াজ আলীর ছেলে সুজনের সাথে প্রথম বিয়ে হয়। সেখানে তার এক কন্যা সন্তান আছে। এরপর প্রথম বিয়ের ৫ থেকে ৬ বছর পরে রুবেল নামে একজনের সাথে পরকীয়া প্রেম গড়ে ওঠে। রুবেল কুমারখালী উপজেলার চাদপুর ইউনিয়নের কাঞ্চনপুর গ্রামের সরোয়ারের ছেলে। পরকীয়া প্রেমের জেরে প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে রুবেলকে বিয়ে করেন আসমা। সেখানেও তিনি এক ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। গুলিতে নিহত সেই ছেলে রবিন। কিন্তু এখানে বনিবনা না হওয়ায় রুবেলকে ডিভোর্স দেয় আসমা।
একাধিক বিশ্বস্ত সুত্রে জানা গেছে, সৌমেন রায় উপ সহকারি পুলিশ পরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে ২০১৬ সালের ১৩ মে কুমারখালী থানায় যোগদান করেন। এরপর কোন এক ঘটনার তদন্তে আছমার বাড়িতে যান সৌমেন রায়। সেখান থেকেই তাদের পরিচয় এবং এক পর্যায়ে পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে তাদের। সৌমেন রায়ের সাথে বিয়ের ব্যাপারটি স্থানীয়দের কাছে স্পষ্ট না হলেও তাদের চলাফেরা ও যোগাযোগের বিষয়টি জানতেন তারা। সৌমেন মাগুড়া জেলার শালিকা উপজেলার কসবা থানার বাসিন্দা। সেখানেও তার স্ত্রী ও এক ছেলে রয়েছে।
বাগুলাট ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেন বক্কর বলেন, এএসআই সৌমেনের সাথে বিয়ে হয়েছে কি না জানা নেই। তবে সৌমেনের সাথে গভীর সম্পর্কের কথা অনেকেই জানেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৌমেন কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার হালসা পুলিশ ক্যাম্পে কর্মরত থাকার সুবাদে আসমা ও সৌমেন কুষ্টিয়া শহরে বাসা ভাড়া করে থাকতেন। পরে খুলনার ফুলতলা থানায় সৌমেন বদলি হয়ে গেলে ছেলেকে নিয়ে শহরের ভাড়া বাসায়ই থাকতেন আসমা। কাস্টম মোড়ে শাকিলের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকান থাকায় প্রায়ই সেখানে যাতায়াত ছিল আসমার। এর সূত্র ধরে শাকিলের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন আসমা। বিষয়টি সৌমেন জানার পর একাধিকবার আসমাকে সতর্ক করেন এবং তাদের মধ্যে এ নিয়ে মনোমালিন্য হয়।
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই সেখান থেকে একজনকে আটক করা হয়েছে। ওই ব্যক্তিই গুলি চালিয়েছেন। হত্যায় ব্যবহৃত পিস্তল জব্দ করা হয়েছে। বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে এই হত্যাকান্ড ঘটে থাকতে পারে। আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিস্তারিত জানানো হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *