প্রস্তাবিত প্রাগপুর স্থলবন্দর বাস্তবায়ন হলে বাড়বে অর্থনৈতিক গুরুত্ব


#ঢাকা-কলকাতার দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে ১০০ কিলোমিটার

#কমবে পরিবহন খরচ

#ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় দু’দেশের আমদানী-রপ্তানীর ক্ষেত্রে ফের ব্যাপক সম্ভাবনার সুযোগ

#তৎকালীন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী কুষ্টিয়া সফরে এসে প্রাগপুর সীমান্তে স্থলবান্দর স্থাপনের ঘোষনা দেন

বিশেষ প্রতিনিধি

এপারে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর আর ওপারে ভারতের নদীয়া জেলার শিকারপুর। মাঝখানে সরু ফিতার মত বয়ে চলেছে মাথাভাঙা নদী। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও বহন করে চলেছে প্রাগপুর-শিকারপুর সীমান্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে দলে দলে বাঙ্গালীরা ওপারে যান যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে আবার কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। ওপারে শিকারপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে। এনেছিলেন বিজয় পতাকা। তাই প্রাগপুর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত শিকারপুরের সাথে যোগাযোগ দৌলতপুরের মানুষের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন। ফলে ঐতিহ্য সেই সীমান্তেই দু’দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজতর করতে স্থল বন্দর স্থাপনের উদ্যোগ দু’দেশের ঐতিহাসিক গুরুত্বও বহন করতে পারে। প্রাগপুর থেকে লালনশাহ সেতু হয়ে জাতীয় মহাসড়ক মাত্র ২০ কিলোমিটার ও ওপারে পশ্চিমবঙ্গের শিকারপুরে ভারতের জাতীয় মহাসড়ক। ব্রিটিশ আমলে মাথাভাঙ্গা নদীর ওপর একটি সেতু ছিল। সে সময় ব্যবসা-বানিজ্য ও মানুষের যাতায়াতের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করা হতো প্রাগপুরকে। কালক্রমে ওই সেতু বিলীন হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা-বাণিজ্য। তাই ব্যবসা-বানিজ্য সহজতর করতে ফের পথটি চালু করা দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় প্রস্তাবিত প্রাগপুরে স্থলবন্দর বাস্তবায়িত হলে দু’দেশের আমদানী-রপ্তানীর ক্ষেত্রে ফের ব্যাপক সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। প্রাগপুর স্থল বন্দর বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-কলকাতার দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে ১০০ কিলোমিটার। যা দু’দেশের পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরণের অর্থনৈতিক সাশ্রয় করতে পারবে। এছাড়া প্রাগপুরে স্থলবন্দর বাস্তবায়িত করতে অবকাঠামো তৈরীর ক্ষেত্রেও বড় কোন অর্থের দরার হবে না দু’দেশের সরকারের। মহাসড়ক কাছাকাছি হওয়ায় অনায়াসে পন্য আমদানী-রপ্তানী করা মত অনুকুল পরিবেশ রয়েছে। শুধুমাত্র মাথাভাঙ্গা নদীর উপর ছোট্র একটি ব্রীজ নির্মান করা দরকার। তাছাড়া বৈধ পথে পন্য আমদানী-রপ্তানীর সুযোগ সৃষ্টি হলে চোরাচালানসহ অবৈধ পথে পন্য আনা নেয়াও বন্ধ হবে। ফলে প্রচুর পরিমানে রাজস্ব পাবে সরকার। সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মস্থান। তাই প্রস্তাবিত এই স্থলবন্দরটির দ্রুত বাস্তবায়ন চান স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারন মানুষ। অর্থনেতিক ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত হওয়ায় ঐহিহাসিক গুরুত্ব দিয়ে ২০১১ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। সে অনুযায়ী তৎকালীন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান কুষ্টিয়ায় সফরে এসে প্রাগপুর সীমান্তে স্থলবান্দর স্থাপনের ঘোষনা দেন। এরপর প্রাগপুর সীমান্তে সরেজমিনে এসে স্থলবন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাই করে গেছেন নৌপরিহবন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলও। ভূমি জরিপসহ অন্যান্য কাজও হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও প্রাগপুরে স্থলবন্দর স্থাপনের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ভারতের সাথে নতুন করে যে ৬টি স্থলবন্দর স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে তার মধ্যে প্রাগপুর স্থলবন্দর অন্যতম। সম্পতি জাতীয় সংসদে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সাংসদ অ্যাড. আ. কা. ম. সারওয়ার জাহান বাদশাহ প্রাগপুরে স্থালবন্দর বাস্তবায়নের বিষয়ে জনতে চাইলে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ৬টি নতুন প্রস্তাবিত স্থল বন্দরের মধ্যে প্রাগপুর স্থলবন্দর এক নম্বরে রয়েছে বলে সংসদকে অবগত করেন। স্থানীয় বানিন্দা মজিদ আলী শেখ বলেন, স্থলবন্দরটি বাস্তবায়ন হলে নতুন নতুন কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে পদ্মানদীর ভাঙনে প্রায় নি:স্ব একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ভাগ্য বদলের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে এই স্থলবন্দর। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা হিসাব উদ্দীন বলেন, ভারতের শিকারপুর, জমশেদপুর, কুরিমপুরসহ আশপাশের অনেক স্থানের সাথে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জড়িত আছে। প্রাগপুরে স্থলবন্দর হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধের এসব ইতিহাস সঠিকভাবে জানার সুযোগ পাবে।
প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুকুল বিশ্বাস বলেন, প্রাগপুরের থেকে লালনশাহ ও বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে রাজধানী ঢাকা-কোলকাতার সাথে খুব কম খরচে ও দ্রুত সময়ে যোগাযোগ করা যাবে। তাছাড়া অন্যান্য জেলার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় কম খরচে দ্রুত সময়ে পন্য আনা নেয়া সহজ হবে।
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সাংসদ আ. কা. ম সরওয়ার জাহান বাদশাহ বলেন, দৌলতপুর তথা কুষ্টিয়ার মানুষের প্রাণের দাবী প্রাগপুর স্থলবন্দর বাস্তবায়ন করা। স্থলবন্দরটি বাস্তবানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এটি বাস্তবায়ন হলে শুধুমাত্র দৌলতপুরের অর্থনীতি নয় বরং জাতীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে। অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি ভারতের শিকারপুরের সাথে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি জড়িত থাকায় ঐতিহাসিক ভাবেও প্রাগপুরে স্থলবন্দর বাস্তবায়ন হওয়া জরুরী।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *