বহুতল ভবন নির্মাণে পৌর আইন মানেন না বেশিরভাগ ভবন মালিক



নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট পড়ে আব্দুল আলীম এখন জিন্দা লাশ

এম.লিটন-উজ-জামান
চারপাশ জাল দিয়ে ঢেকে ও নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে বহুতল ভবন নির্মাণের বিধান থাকলেও কুষ্টিয়ার নির্মাণাধীন বহুতল ভবন মালিক বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই তা মানছে না। ফলে নির্মাণাধীন ভবনগুলো পথচারীদের জন্য ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। গত মে মাসে এমনই এক ঘটনা ঘটে শহরের আলফার মোড় এলাকায়। পেশায় ডাক্তার আর ব্যবসায়ী ৪ জন ভবন মালিকের যৌথ মালিকানায় আলফার মোড় এলাকায় গড়ে উঠছে একটি বহুতল ভবন। কোন রকম নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই চলছে এই বহুতল ভবন তৈরীর কাজ। ভবনের পাশেই আলফার মোড় জামে মসজিদ। প্রতিদিন শতশত মুসল্লি এই মসজিদে নামায আদায় করতে আসেন। মসজিদ থেকে নামাজ আদায় শেষে বাসায় ফেরার পথে একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আলীম (৫১) নামের এক পথচারী নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট পড়ে মারাত্বক আহত হন। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ১৮ রমজান দুপুর ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পরেই তাকে দ্রুত ঢাকায় রেফার্ড করেন।
আহত আব্দুল আলীমের বড় ভাইয়ের মেয়ে জানান, ১৮ রমজান আমার চাচা আব্দুল আলীম আলফার মোড় জামে মসজিদে নামায আদায় করতে যায়,নামায শেষে বাসায় ফেরার পথে মসজিদ সংলগ্ন ডাক্তারদের বহুতল ভবন থেকে ইট পড়ে মারাত্বক আহত হয় চাচা আব্দুল আলীম। বিষয়টি পাশের দোকানদার আমাদের ফোন করে জানানোর পর আমরা ঘটনাস্থলে যেয়ে দেখি সে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয়দের সহযোগীতায় দ্রুত তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চাচার প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পরে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকায় দীর্ঘ ১৫ দিন নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে(আইসিইউ) থাকার পরে তার জ্ঞান ফিরে আসে। এরপর এক মাসের অধিক সময় ঢাকায় চিকিৎসা শেষে আমার চাচা বাড়ি ফিরলেও সে আগের মত সুস্থ স্বাভাবিক নয়, একজন প্রতিবন্ধী মানুষের মত বর্তমান তার চলাফেরা। তিনি আরো জানান,ডাক্তাররা বাড়ী তৈরী করছে শুরু থেকেই কোন প্রটেকশন না দিয়ে কাজ করার ফলে রাস্তার পথচারীদের মাথায় মাঝে মাঝেই ইট খোয়া বালি পড়ে। যদি প্রটেকশন দিয়ে ডাক্তাররা বাড়ী করতো তাহলে আজ আমার চাচার এই দূর্ঘটনার কবলে পড়তে হতো না। নির্মাণস্থলে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়নি ভবন মালিকেরা আর তাদের সামান্য অবহেলার কারনে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের একজন মানুষ আমার চাচা আব্দুল আলীম আজ বেঁচে থেকেও জিন্দা লাশ।
স্থানীয় দোকানদার মানিক জানান, আমার দোকানের সামনেই মসজিদ আর মসজিদ সংলগ্ন নির্মাণাধীন ভবন। ঘটনার দিন আমি আমার দোকানে কর্মরত ছিলাম হঠাৎ একটি শব্দ কানে ভেসে আসে। দৌড়ে যেয়ে দেখি আব্দুল আলীমের মাথা ও ঘাঁড়ের উপর দুইটা ইট পড়ে রক্তাত্ব অবস্থায় মাটিয়ে পড়ে আছে তাকে উদ্ধার করে আমরা সবাই কুষ্টিয়া হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। তিনি বলেন পুরো বিল্ডিংটাই আলগা করে কাজ করার ফলে প্রায়ই ভবনের ওপর থেকে ইট, কাঠ, পাথর, রড, বাঁশ, যন্ত্রপাতি, পাইপসহ নির্মাণসামগ্রী রাস্তার উপর পড়ে দূর্ঘটনার প্রধান শিকার হচ্ছে মসজিদের আগত মুসল্লি ও পথচারী। এছাড়াও দুই থেকে তিনদিন ঐ ভবনের নির্মাণ শ্রমিক নিচে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর এলাকাবাসী ঐ ভবনের কাজ বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন পরেই ভবনের সামনে সামান্য টিন বা নেট টাঙিয়ে পথচারীদের সাবধান করে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। ফলে নির্মাণাধীন ভবনের নিচ দিয়ে চলাচলকারীদের আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
নির্মাণাধীন ভবনের দায়িত্বে থাকা একজন তত্বাবধায়ক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, মসজিদ থেকে নামায পড়ে আলীম ভাই রাস্তার উপর ভ্যানে থাকা আনারস কেনার জন্য দাঁড়াই আমিও পাশে এসে দাঁড়াতেই নির্মাণাধীন ভবনের সিলিং থেকে একটি ইট এসে আলীম ভাইয়ের মাথার উপর পড়ে সেখানেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, মালিকদের ভূলের কারণেই এই রকম ঘটনা ঘটেছে। শুরুর দিকে মালিকরা কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী না করে কাজ করায় এরকম ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সিরাজ জানান, আলীম আমাদের এলাকার নিরীহ শান্ত প্রকৃতির একজন মানুষ। একসাথে নামায শেষ করে বের হতেই নির্মাণাধীন ভবনের মালিক আর অদক্ষ্য শ্রমিকের ভূলের কারনে তার মাথার উপর ইট পড়ে চোখের সামনেই মারাত্বক আহত হয়। তিনি বলেন,মালিকদের গাফলতির কারনে একটা তাজা প্রাণ আজ মুত্যুর দুয়ারে। এরকম ঘটনা যেন আর কারো জীবনে না ঘটে এবং মালিকদের আরো সচেতন হতে হবে।
ভবন মালিক মিরপুর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডেন্টাল সার্জন ডাক্তার সাজ্জাদুল ইসলাম সজিব প্রথমেই ক্যামেরা দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন ও ক্যামেরা সরিয়ে নিতে বলেন। তিনি বলেন আমাদের ভবনের কাজ চলমান রয়েছে। আমাদের ঠিকমতো যাওয়া হয়না সেখানে। ভবনের নিরাপত্তা বেষ্টনী দিতে একটু দেরি হয়ে গেছে। তিনি বলেন দূর্ঘটনার শিকার আব্দুল আলীমের জন্য আমাদের অনেক টাকা ইনভেষ্ট হয়ে গেছে। এই বিষয়ে যেন নিউজ প্রচার না হয় তাই তিনি সাংবাদিকদের কাছে থেকে সময় চেয়ে নেন।
এছাড়া ভবনের মালিকানায় থাকা মিরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডাঃ কাউসার ও পলাশ নামে এক ব্যবসায়ীর মুঠোফোনে যোগযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।
আহত আব্দুল আলীম বলেন, আমার এই দূর্ঘটনার তিনদিন আগেও ঐ ভবনের মালিকদের বলেছিলাম চারপাশ জাল দিয়ে ঢেকে ও নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। যদি তারা আমার এই কথা শুনতো তাহলে আজ আমি এই দূর্ঘটনার কবলে পড়তাম না। এই ভবনের উপর থেকে একটি ইট এসে আমার মাথার উপর পড়ে। আমি একজন সুস্থ্য ও স্বাভাবিক মানুষ, রমজান মাসের রোযা ছিলাম, মসজিদ থেকে নামায় আদায় করে আসতেই পাশে নির্মিত ভবন থেকে একটি ইট পড়ে আমি অচেতন হয়ে পড়ি তারপর প্রায় ১৫ দিন পর আমার জ্ঞান ফিরে আসে। মাথার বাম পাশে আঘাত লাগার কারনে সে এখন সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসতে পারবেনা বলে মনে করেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *