ভয়ঙ্কর করোনা পরিস্থিতির শঙ্কা



এনএনবি :

দেশে গত ২৯ মার্চ থেকে শুরু হওয়া লকডাউন নামকাওয়াস্তে চলছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে গত কয়েক দিনে যেভাবে ঈদের কেনাকাটা করতে মানুষ ভিড় করছে, গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে পথে পথে ঢল নেমেছে লাখো মানুষের, তাতে আতঙ্কিত হয়ে বারবার সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন সরকার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বালাই নেই।
ফলে আগামী ১-২ সপ্তাহ পর দেশে করোনা সংক্রমণের হার আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা টিকার সংকট ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। প্রথম ডোজের টিকাদান বন্ধ রয়েছে। দ্বিতীয় ডোজেরও সংকট রয়েছে। কবে দেশে ফের টিকা পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়। এছাড়া ইতোমধ্যেই দেশে ছয়জন রোগীর দেহে করোনার ভারতীয় ধরন ধরা পড়েছে। ফলে এবার রোগী সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপিডেমিওলজিক্যাল ১৭ তম সপ্তাহে মোট এক লাখ ৬১ হাজার ২৪২টি নমুনা পরীক্ষা, ১৮ হাজার ১৮৪ জন রোগী শনাক্ত, ৩১ হাজার ৫২০ জন সুস্থ এবং ৫৫৮ জনের মৃত্যু হয়।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৮ তম সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা এক লাখ ২৯ হাজার ১৫৮, শনাক্ত ১১ হাজার ৫৪৩ জন, সুস্থ রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ১৬২ এবং মৃত্যু ৩৬৮ জনে নেমে আসে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, গত ২৯ মার্চ থেকে চলমান লকডাউনসহ নানান উদ্যোগে করোনা সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা কমে এলেও তারা উদ্বেগমুক্ত হতে পারছেন না। সামনে বিপদের আশঙ্কা করছেন।
কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২৯ মার্চ থেকে দুই-তিন সপ্তাহ লকডাউনের ফলে যে সুফল আমরা পেয়েছি, তা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ঈদ শপিং ও বাড়ি ফেরার নামে হাজার হাজার মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। আগামী ১-২ সপ্তাহের মধ্যে তাদের অনেকেই করোনা আক্রান্ত হতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘রাজধানীসহ সারা দেশে সাধারণ ও আইসিইউ এবং আইসিইউ সমমানের বেড বৃদ্ধিসহ করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বাত্মক প্রস্তুতি থাকলেও রোগী সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলে তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।’
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন শনিবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে আলাপকালে বলেন, ‘আগামী ১-২ সপ্তাহ পর রোগী বৃদ্ধি পেলে আবার কঠোর লকডাউনে যাবে সরকার।’
আলোচনায় অংশগ্রহণ করে মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, ‘যে পদক্ষেপ রোগী বৃদ্ধির পর নেয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, সংক্রমণরোধে তা এ মুহূর্তেই করা উচিত।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘এ মুহূর্তে দেশে টিকার সংকট থাকায় মাস্ক পরাসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। না হলে সামনে করোনার ভয়াবহ বিপদ আসতে পারে।’
করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনার ভিত্তিতে দেশে চলছে ‘লকডাউন’ পরিস্থিতি। জীবন-জীবিকার স্বার্থে শর্ত সাপেক্ষে কিছুটা শিথিল পদক্ষেপও রাখা হয়েছে। এক জেলা থেকে যাতে অন্য জেলায় সংক্রমণ ছড়াতে না পারে সে জন্য দূরপাল্লার জনবহুল যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে। দেশের বাইরে থেকে দেশে সংক্রমণ ঠেকানোর লক্ষ্যে সীমান্ত বন্ধ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী ও পরিবহন সেক্টরের দাবির মুখে মার্কেট-দোকানপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। চালু করা হয়েছে জেলা বা মহানগরীর ভেতরে গণপরিবহন। সব ক্ষেত্রে শর্ত রয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মানার। কিন্তু দৃশ্যত সব শর্ত ভেঙে ঈদের কেনাকাটায় যেমন মানুষের ঢল নেমেছে, ঢল নেমেছে ঢাকা থেকে গ্রামের উদ্দেশে মানুষের যাতায়াতেও।
ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি, সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সবাই বলছেন সতর্ক না হলে ঈদের পরে চরম খারাপ পরিণতি ঘটতে পারে। আগের চেয়েও চূড়ায় উঠে যেতে পারে সংক্রমণ, লাফিয়ে উঠতে পারে মৃত্যু, যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেরও নেই।
এদিকে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, যা দেখছিÑ খুবই দুঃখজনক। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ঈদের পড়ে সংক্রমণ, মৃত্যু ঠেকানো বা হাসপাতালে রোগীর চাপ সামাল দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, এখন প্রয়োজনে আবার সব কিছু বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা সরকারকে সেই পরামর্শ দেবো। কারণ ইতিমধ্যেই দেশে ভারতীয় ভেরিয়েন্ট ঢুকে পড়েছে। এটা যুক্তরাজ্য, চীন, ইতালি কিংবা সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্টের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত ছড়াতে সক্ষম। আমরা খুবই উদ্বিগ্ন ঈদের পরের কি পরিণতি হবে সেই আশঙ্কায়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *