মাদক নিয়ে হই সচেতন, বাঁচাই প্রজন্ম, বাঁচাই জীবন


মীর আব্দুর রাজ্জাক

মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আর্ন্তজাতিক দিবস ২৬ জুন। এবারের প্রতিপাদ্য- “ মাদক নিয়ে হই সচেতন, বাঁচাই প্রজন্ম, বাঁচাই জীবন”। মাদক দ্রব্য যা মত্ততা জন্মায় বা মাতলামী করায় যার আরবী প্রতিশব্দ ‘খমর‘ এর অর্থ সমাচ্ছন্ন করা, ঢেকে দেওয়া। ড্রাগস অর্থ ঔষধ, নেশা, ভেষজ, ঘুমপাড়ানি পদার্থ আর নারকটিক অর্থ নিদ্রাকারক, বাচুনাবিলোপকারী । যে সকল বস্ত সেবন করলে মাদকতা বা আসক্তি তৈরী হয় এবং বুদ্ধিকে আচ্ছন করে ফেলে অথবা বোধশক্তি উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে তাকে মাদকদ্রব্য বলে। পরিবর্তনশীল বিশ্ব এবং বিবর্তনের সাথে সাথে প্রযুক্তির উৎসকর্ষতায় নতুন নতুন শ্রেণীর মাদকের সৃষ্টি হওয়ায় মাদকের সংজ্ঞা পূর্ব অপেক্ষা বিস্তৃত হয়েছে। শিশা ও ইয়াবাকে নতুন আইনে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। পূর্বের আইনে মোট ২১টি বিষয়ে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছিলো। ২০১৮ সালের আইনে ৩৬টি
মাদকাসক্ত হওয়ার পূর্ব লক্ষণ : আমরা সাধারণত মাদকাসক্তির লক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা করে থাকি। কিন্ত সন্তান বা আপনজন মাদকাসক্ত হওয়ার পূর্বেই পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের তার কিছু ব্যবহার-আচরণ বা আচরণগত পরিবর্তন দেখে বা লক্ষণ পরিলক্ষিত হলে বুঝতে হবে সে মাদকাসক্ত হওয়ার সম্ভাব্যতা বা ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই বিষয়ে পরিবার ও সমাজে চলমানাকারে সচেতনতামূলক প্রচারণা থাকা খুবই জরুরী। যেমন, ধূমপান শুরু করা; জুয়া ও লাটারি খেলা ও কেনা ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী; অতিরিক্ত রাত পর্যন্ত জেগে থাকা; যে কোন বিষয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া, অবসাদ গ্রস্থ থাকা; হুট করে রেগে যাওয়া; রাতে ঘুমের সমস্যা হওয়া; মানসিক রোগ থাকলে; যদি কখনো কাহারও দ্বারা অপব্যবহার হয়ে থাকে, আঘাতজনিত বা ট্রমাটিক কোন ঘটনা ঘটলে; ইত্যাদি। সূচনাতে এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ বা মানসিক অবস্থা দেখলে অবশ্যই পিতামাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাধান হওয়া জরুরী। পরিবার ও সমাজ যদি সচেতন না হয় তাহলে শুধুু রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের সংশি¬ষ্ট বিভাগের উপর দায়ভার বা ব্যর্থতা চাপিয়ে আমরা সন্তান বা আপনজনদের সুন্দর জীবনের সহযাত্রী হতে পারবো না। আমাদের সন্তানদের দিতে পারবো না মাদকের ঝুঁকিমুক্ত সুন্দর সুস্থ্য পরিবেশ।
মাদকাসক্ত হওয়ার লক্ষণ : হঠাৎ নতুন বন্ধু-বান্থবদের সাথে চলাফেরা করা; বিভিন্ন অজুহাতে ঘনঘন টাকা চাওয়া; ক্রমান্বয়ে বিলম্বে বাড়িতে ফেরত আসা; পেঁচার মতো দিনে ঘুম ও রাত্রে জেগে থাকার প্রবণতা; ঘুম থেকে জাগার পর অস্বাভাবিক আচরণ করা; খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দেওয়া এবং ওজন কমতে থাকা; অতিরিক্ত মাত্রায় মিষ্টি খেতে আরম্ভ করা ও ঘনঘন চা খাওয়া; নানা বাহানায় দীর্ঘ সময় টয়লেটে সময় কাটানো এবং কোষ্ঠ কাঠিন্যে ভোগা অথবা ঘনঘন পাতলা পায়খানা হওয়া; প্রচুর ঘাম হওয়া, অস্থিরতা ও অস্বস্থি বোধ করা; যৌন ক্রিয়ায় অনিহা ও যৌন ক্ষতা হ্রসি; মিথ্যা কতা বলার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া; পরিবারের সদস্যদের সাথে গরমিল; অকারণে বিরক্ত হতে আরম্ভ করা এবং মন-মানসিকতায় আকস্মিক মারাত্মক পরিবর্তন দেখা দেওয়া; কামরায় সিগারেটের তামাক আলগা পড়ে থাকতে অথবা প¬াষ্টিকের ছোট বোতল, কাগজের পুরিয়া, ইনজেকশন, খালি শিশি, পোড়ানো দেয়াশলাইয়ের কাঠি ইত্যাদি ঘন ঘন পাওয়া; লেখাপড়া, খেলাধূলাসহ স্বাভাবিক কাজকর্মে অঅগ্রহীনতা; কাপড় চোপড়ে বাজে গন্ধ ও পোড়া দাগ থাকা ইত্যাদি।
মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় : * পরিবারের কেউ যেন মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবহারে জড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে সর্বদা সর্তক থাকতে হবে; * পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা, কাজের ফাঁকে ফাঁকে সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, তাদের বই পড়া, খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা এবং খারাপ বন্দুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে না দেওয়া; * সন্তানের সামনে স্বামী-স্ত্রী বিরোধ না করা, নিজেরা সংযত জীবনযাপন এবং সন্তানকে ছোটবেলা থেকে সংযত জীবন ডাপনের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া। পরিবারের মধ্যে মানবিক মূল্রবোধ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের বিকাশ ঘটানো; * পরিবারের কোন মাদকাসক্ত ব্যক্তি থাকলে তাকে অপরাধী না ভেবে এবং তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ কিংবা তাকে উপেক্ষা না করে বরং একজন রোগাক্রান্ত বা অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে সাহায্য ও ভালবাসার হাত বাড়িয়ে দ্রুত তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা; * সন্তানের সামনে ধূমপান বা নেশা না করা, ধূমপান বা নেশার উপকরণ ১৮ বছরের নিচে কাউকে দিয়ে ক্রয় না করানো। সন্তানের কোন স্বাভাবিক কৌতুহলকে উপযুক্ত ব্যাখা এবং জবাবের মাধ্যমে নিবৃত্ত করা এবং মাদকের কুফল সর্ম্পকে তাকে বুঝানো; * সন্তানের চাল-চলন, কথাবার্তা, অন্যের সাথে মেলামেশা, গরের বাইরে যাওয়া এবং সময়মত ফিরে না আসা, খাওয়া দাওয়া, মেজাজ, আচরণ, অভ্যাস বন্ধু-বান্ধব ইত্যাদি সর্ম্পকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সন্দেহজনক কিছু খেলে সেমর্স্পকে খোঁজ নিতে হবে; * সন্তানের অতিশাসন কিংবা অতিআদর না করা এবং যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া সন্তানের হাতে টাকা দেওয়া উচিৎ নয়। কোন কাজে সন্তানের ব্যর্থতায় শাস্তি নয়, শান্তনা ও পরামর্শের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে; * সন্তান একরোখা, স্বেচ্ছাচারী, জেদী কলহপ্রবণ, মারমুখী কিংবা দূবৃল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হলে শৈশবেই তার মনস্বাত্বিক বিকাশের চেষ্টা করা এবং তাকে আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও সুস্থ শিশু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নতুবা বড় হলে সে সহজেই বন্ধুদের প্রভাবে মাদকাসক্ত হয়ে যেতে পারে; * মাদক অপরাধ দমনে যে কোন কাজে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাকে স্বত:স্ফূর্ত ভাবে সাহার্য্য করা; * অবৈধ মাদকদ্রব্য বিক্রি বা চোরাচালান হতে দেখলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থাকে খবর দেওয়া; * পাড়ায় পাড়ায় অবৈধ মাদক ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবহারের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা; * মাদক পরিহারের জন্য মানসিকভাবে দৃঢ প্রতিজ্ঞ থাকা; * সর্বোপরি চাহিদা হ্রাস, যোগান হ্রাস, ক্ষতি হ্রাস ও রাজনৈতিক সদদিচ্ছা থাকতে হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *