‘মা ও ছেলে’ একে অপরের শক্তি



কুমারখালী প্রতিনিধি

অন্ধ রোগাটে ছেলে বাম হাতে একটা ব্যাগ ও ডান হাত দিয়ে মায়ের বাম হাতেই কনুই ধরে রাখে আর অসুস্থ বৃদ্ধা মা বাম হাতের আঙ্গুলের অংশ উলটিয়ে মাঝায় ভর এবং ডান হাতে একটি বাঁশের লাঠি ভর করে কুঁজা হয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এদোকান থেকে ওদোকান, এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি মানুষের দ্বারেদ্বারে হাফিয়ে হাফিয়ে ঘুরেঘুরে বেড়ান তারা। সুন্দর এই পৃথিবীতে মানুষের অনেক আশা, চাওয়া – পাওয়া, স্বপ্ন, বাসনা, কামনা থাকলেও শুধু মুঠোভরে একবেলা খাবারের আসায় ভিক্ষাবৃত্তি করেন তারা। বৃদ্ধা এই অভাগী মায়ের নাম সাহেরা খাতুন। তার বয়স পঁয়ষট্টি (৬৫) ছাড়ালো। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামের মৃত মরসুর আলীর দ্বিতীয় স্ত্রী। আর হতভাগ্য অন্ধ ছেলের নাম তমিজ মোল্লা। বয়স পঁয়তাল্লিশ (৪৫) এর মত। জীবন ধারনের জন্য দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামে সোয়া কাঠা জমির উপর ছোট্ট একরুমের একচালা টিনের ঘর, একটি রান্নাঘর, একটি টিউবওয়েল ও একটি স্যানিটারি ল্যাটিং রয়েছে। সেখানে একরুমের ছোট্ট ঘরে ছোট্ট একটি চৌকিতেই ঘুমান মা ও ছেলে। দিনের অধিকাংশ সময় কাটে এই ছোট্ট টিনের ঘরে। আসরের আযান কানে বাজলেই তাদের এক ভিন্ন পৃথিবীতে নেমে আস কাল রাত। ঘরে খাবার থাকলে খাওয়া শেষে তড়িঘড়ি করে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন তারা। মাঝেমাঝে খাবার না থাকায় অনাহারেই রাত – দিন কাটে তাদের। সরেজমিন গিয়ে প্রতিবেশী ও মা-ছেলের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, প্রায় ৪০ বছর আগে এক ছেলে রেখে মারা যান সাহেরা খাতুনের স্বামী মনসুর আলী। সেসময় ৫ বছর বয়সী তমিজ শ্রমিকদের ভাত টেনেটেনে যা পেত, তা দিয়েই চলত সংসার। এক সময় তমিজ কুমারখালী শহরে সুঁতায় রং লাগানোর কাজ করত। কিন্তু অভাবে সুষম খাদ্যের খাটতি হওয়ায় অপুষ্টিজনিত কারনে ধীরেধীরে লোপ পায় চোখের দৃষ্টিশক্তি আর মা বয়েসের ভারে লুইয়ে পড়ে। সংসারে উপার্জনক্ষম অদ্বিতীয় আর কোন ব্যক্তি না থাকায় শুধু খেয়ে পড়ে কোনমতে বেঁচে থাকতে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছেলে আর বৃদ্ধা মা। সপ্তাহে মাত্র একদিন (শুক্রবার) যদুবয়রা ইউনিয়নের আশরপাশের ছোটছোট বাজার গুলোতে ভিক্ষা করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পান তারা। এথেকে ভ্যানভাড়া বাবদ খরচ হয় ৫০ থেকে ৭০ টাকা। আর অন্যান্যদিন বাড়ির আশেপাশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খাবার খেয়েই বেঁচে থাকেন তারা। মাঝেমাঝে প্রতিবেশীরা খাবার পাঠায় তাদের। তবে সপ্তাহে দুই থেকে দিন না খেয়েই জীবন কাটান মা ছেলে। এভাবে বিশটি (২০) বছর কেটে গেলেও কাটেনি অভাব – অনটন, দুঃখ – দুর্দশা আর যন্ত্রণা। আরো জানা গেছে, সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ছয় মাস পরপর মা বিধবা আর ছেলে প্রতিবন্ধীভাতা হিসেবে সাত হাজার টাকা পান তারা। তাদের একটি ১০ টাকা কেজি চালের কার্ডও আছে। এবিষয়ে নাম ও ছবি প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী বলেন, তমিজ চোখে দেখেনা আর ওর মা কানে কম শোনে, বয়সের ভারে দাঁড়াতে পারেনা। রোগেশোকে খুব কষ্টের জীবন ওদের। একঘরে এক বেডে মা ছেলে থাকেন। একটু বাতাস হলেই ঘরের চাল উড়ে যায়। ভিক্ষা করে কিনেকাটে আনে দেয় আর আমরা রান্না করে দিই। কোনকোনদিন পাড়ার লোকেরা খাবার দিয়ে যায়, আবার কখনও না খেয়েই থাকেন। এবিষয়ে দুঃখিনী মা সাহেরা খাতুন বলেন, অন্ধ ছোয়ালকে (ছেলে) নিয়ে এই বয়সে আর চলতে পারিনা। নিজেও হাটতে পারিনা। দুই পা হাটলেই হাফিয়ে পড়ি। তবও শুধু খাওয়ার জন্য চলা। পৃথিবী আর ভাল লাগেনা। আল্লাহ কবে নেবে সেই আশায় থাকি। তিনি বলেন, কিছুই আর চাওয়ার নাই কারো কাছে, শুধু ইটু (একটু) খেতে চাই। পারলে ইটু (খাবার) খাবার দেন। তবে কোন কথায় বলতে চাননি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তমিজ। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে শুধু নিরব থাকে। আবার একটু খাবার জাতীয় দ্রব্য হাতে দিলে আনন্দে ফেটে পড়ে। স্থানীয়রা বলেন, যেকদিন বাঁচে মা ছেলের। সেকদিন ওদের একটু ভাল বাসস্থান আর খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার। যদুবয়রা ইউরিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম বলেন, মা ছেলের নামে ভাতা চলমান আছে। জানি শুধু ভাতার টাকায় দুটো জীবন চলা সম্ভব নয়। কিন্তু এছাড়া তো অতিরিক্ত কিছু করার নেই। তিনি আরো বলেন, পরিষদে যদি নতুন কোন সুযোগ সুবিধা আসে, তাহলে অবশ্যয় তারা পাবেন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান বলেন, এখনও এমন দুঃখ, দুর্দশার মানুষ আছে সাংবাদিকরা না থাকলে জানতে পারতাম না। আমি খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করব।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *