২৮ বছরের অধ্যক্ষ’র জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করলেন শিক্ষাবিদ আসলাম উদ্দীন


দৈনিক আজকের আলো পত্রিকায় একান্ত সাক্ষাতকার

শাহ্ জামাল
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিজেএম ডিগ্রী কলেজের ২৮ বছরের অধ্যক্ষ’র জীবন থেকে অবসর গ্রহন করেছেন ভেড়ামারার কৃতি সন্তান শিক্ষাবিদ মোঃ আসলাম উদ্দীন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একজন সাহসী প্রশাসক। সততা, কর্তব্য পরায়নতা, নিষ্টা আর যোগ্যতা দিয়ে তিনি বারবার পেয়েছিলেন সেরা অধ্যক্ষ’র স্বিকৃতি। সফলতার সাথে তিনি ২৮ বছরের শিক্ষা জীবন শেষ করে সুনামের সহিত সম্মান নিশ্চিত করে তিনি গত ৮ জুলাই বিদায় নিয়েছেন বিজেএম ডিগ্রী কলেজের আঙ্গিনা থেকে। স্বল্প এ সময়ে তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে আলোকিত করেছেন ভেড়ামারা উপজেলাকে। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী শিক্ষাগুরুর বিদায়ের পর তার একান্ত সাক্ষাতকার নিয়েছেন ভেড়ামারার বিশিষ্ট সাংবাদিক, দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক শাহ্ জামাল। সাক্ষাতকারের চম্বুক অংশ পাঠকদের সামনে পত্রস্থ করা হলো।

শাহ্ জামাল ঃ স্যার, আপনি কেমন আছেন ?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ আপনাদের দোয়াই ভালো আছি।

শাহ্ জামাল ঃ ২৮ বছর চাকুরী জীবন শেষ করে অবসরে গেলেন কেমন লাগছে ?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ হ্যাঁ, ২৮ বছরের সফল চাকুরী জীবন শেষ করলাম। জীবনের একটা অধ্যায় শেষ করলাম বলতে পারেন। সম্মান নিয়ে অবসরে যেতে পেরেছি বলে ভালই লাগছে।

শাহ্ জামাল ঃ বিদায়ের দিনটি কেমন ছিল ? একটু যদি অনভূতি গুলো শেয়ার করতেন স্যার।
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ বিদায়ের দিনটি আমার জন্য অনেক আনন্দের ছিল। আবার ছিল বিষাদেরও। আনন্দের এ জন্যই যে, আমি ১৯৯৩ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করে ২৮বছর চাকুরী জীবন সফলভাবে সমাপ্ত করতে পেরেছি। এ জন্যই আজকের দিনটি আমার জন্য অত্যান্ত আনন্দের। আর বিষাদের এ জন্যই যে, ২৮ বছরের স্মৃতি বিজড়িত আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান বিজেএম কলেজ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটা ইট, বালিকনার সাথে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস লেগে আছে। আর আমার প্রিয় সহকর্মী শিক্ষকগণ যাদের কে সাথে নিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠাতা করেছিলাম। যাদের ভালবাসায় আমি সিক্ত হয়েছি। সেই সহকর্মীদেরও রেখে যাচ্ছি। এ জন্য দিনটি বিষাদেরও ।

শাহ্ জামাল ঃ কলেজ প্রতিষ্ঠায় আপনি কি সফল?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ আমি তো মনে করি আমি সফল, বাকীটুকু আপনারা বলবেন।

প্রশ্নঃ কলেজের উন্নয়নে আপনি কি কি করেছেন?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ কলেজের উন্নয়নে দৃষ্যত সবই আমার হাতে। শূন্য থেকে শুরু করে আজ কলেজটি অনার্স কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কলেজের জমি, একাডেমিক স্বীকৃতি, বিজ্ঞান বিভাগসহ কৃষি শিক্ষা ও আইসিটি বিষয় চালু, ¯œাতক কোর্স চালু, সর্বশেষ চারতলা বিশিষ্ট বিশাল ভবনসহ শহীদ মিনার নির্মান ও এমপিওভূক্ত করণ।

প্রশ্নঃ কলেজের এখনও অনেক উন্নয়ন দরকার নয় কি?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ ঠিকই বলেছেন এখনও অনেক উন্নয়ন প্রয়োজন। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। ভারতের কালজয়ী শিল্পী মান্নাদেয় ভাষায় বলতে হয় মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, মনে হয় জীবনের কত কাজ সারা হয়ে গেল, আরো কত বাকি রয়ে গেল।

শাহ্ জামাল ঃ ভেড়ামারা বিজেএম ডিগ্রী কলেজ এখন সেরা কলেজের ক্ষ্যাতি অর্জন করেছে। আবকাঠামোর ব্যঅপক উন্নয়ন হয়েছে। কলেজকে এ পর্যায়ে আনতে কার কার ভূমিকা বেশি ছিল বলে আপনি মনে করেন ?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে তৎকালীন চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের নামই প্রথম বলতে হয়। তিনিই আজ থেকে ২৮ বছর আগে ১৯৯৩ সালে আমাকে অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। তাঁর সহযোগীতায় কলেজের একাডেমিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ সুন্দর রাখতে আমি সক্ষম হই। কলেজের উন্নয়নে আর যে সব মহৎপ্রাণ ব্যক্তিবর্গ সহযোগীতা করেছেন, তারা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, কুষ্টিয়া সদরের এমপি আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতা মাহাবুব উল আলম হানিফ, বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচীব, বাহাদুরপুরের কৃতি সন্তান আমার পিতৃত্ব রফিকুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুল হক মাঙ্গন, সাবেক এমপি আহসান হাবীব লিংকন, সকল সাবেক সভাপতিসহ বর্তমান সভাপতি আব্দুল আলীম স্বপন, ড. মঞ্জুর মাহমুদ, মরহুম আহসান উদ্দীন (মনোমহন বিড়ি ফ্যাক্টারী) ও আমার সহকর্মীবৃন্দ। সর্বপরী তিন ইউনিয়নের দলমত নির্বিশেষ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার জনগণ, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

শাহ্ জামাল ঃ আপনি তো ভেড়ামারা উপজেলায় টানা পাঁচবার এবং জেলা পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন ?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ আমি জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপজেলা পর্যায়ে টানা ৫ বার এবং ২০১৯ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ নির্বাচিত হই। জেলা পর্যায়ে আমি শ্রেষ্ঠ হবো এটা আমি ভাবি নাই। আমি মনে করি এটা আমার কাজের মূল্যায়ণ। ১৯৯৩ সাল হতে অদ্যাবদি বিজেএম কলেজের উন্নয়ন ছাড়া কিছুই বুঝতাম না। আমি কোন সময় ভাবতাম না, আমি কলেজে চাকুরি করি। আমি ভাবতাম কলেজ করতে এসেছি। কলেজের উন্নয়ন ছাত্র/ছাত্রীদের লেখা পড়ার সুন্দর পরিবেশ তৈরি এটাই ছিল আমার প্রধান ও একমাত্র কাজ। যার কারণে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করি।
শাহ্ জামাল ঃ আপনি তো পত্রিকায় লেখা-লেখি করেন এবং একটা বইও বের করেছেন। আরও বই বের করবেন কি না ?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ ২০১৭ সালে একুশে বই মেলায় আমার লিখা একটি বই “যে সময় যে কথা” বইটি প্রকাশিত হয়। এ বছর আমার দ্বিতীয় বই “স্মৃতি-বিস্মৃতির পথ পেরিয়ে” বইটি ছাপানো হয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে এখনো আমি হাতে পাইনি। এরপর অবসর জীবনে আমার জীবনীভিত্তিক একটা বই প্রকাশ করব। যেটার পান্ডুলিপি প্রায় প্রস্তুত।

শাহ্ জামাল ঃ কলেজ প্রতিষ্ঠায় আপনার সবচেয়ে বড় সমস্যা কি ছিল এ সম্পর্কে কি কিছু বলবেন ?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুতে আমি চিন্তা করি ইউনিয়ন লেবেলে একটা কলেজ করতে হলে দলমত নির্বিশেষ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ করা। আর এর পূর্ব শর্ত হচ্ছে অধ্যক্ষ হিসেবে আমাকে দলমত নির্বিশেষ সকল শ্রেণীর পেশার মানুষের কাছে নিজের গ্রহণ যোগ্যতা সৃষ্টি করা। এ কাজটি অত্যান্ত কঠিন। কঠিন হলেও আমি তা পেরেছি। গ্রামের মধ্যে শূন্য অবস্থা থেকে কলেজকে অনার্স কলেজে রুপান্তর করতে সক্ষম হয়েছি। আমি মনে করি কলেজ প্রতিষ্ঠায় এটায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল।

শাহ্ জামাল ঃ আপনি অবসরের পর কি করবেন?
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ আমি অবসর সময়ে কলেজসহ অন্যান্য যে হাইস্কুল গুলো আছে সে গুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করবো। মাদক মুক্ত সমাজ গঠনে কাজ করে যাবো। লেখালেখি করব, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিব ও গান শুনবো।
শাহ্ জামাল ঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার আমাকে সময় দেওয়ার জন্য।
অধ্যক্ষ আসলাম উদ্দীন ঃ আপনাকেও ধন্যবাদ। আমার জন্য দোয়া করবেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *