৭০ বছর ধরে গবাদিপশু পালনে সফল হাসতম মন্ডল


ইজাবুল হক

বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে বিশ্ব থমকে গেলেও, থেমে নেই উন্মুক্ত গবাদিপশু পালনকারীদের আয়ের পথে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গোস্বামী দূর্গাপুর ইউনিয়নের উত্তর মাগুরা গ্রামের মৃত সোরাপ মন্ডলের ছেলে মোঃ হাসতম মন্ডল (৭০) কঠোর শ্রম সাধনা আর চরম ধৈযের পরিচয় দিয়ে শূন্য হাত থেকে ১৭ টা গরুর মালিক নিজেই হয়েছেন। জানা যায়, হাসমত মন্ডল প্রায় বছর ত্রিশেক পূর্বে বাবার সংসার থেকে শূন্য হাতে পৃথক (আলাদা) হয়ে প্রতিবেশি জলিল কারিগরের নিকট থেকে একটি ছোট বকনা বাছুর পোষানী (বর্গা) নিয়ে উন্মুক্ত চারণভূমিতে পালন শুরু করেন। পালিত সেই বকনা বাছুর আদর যতেœ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে সেই সাথে হাসমত মন্ডলও সফলতার বীজ বপণ করতে থাকেন পালিত বকনা বাছুরের বুকে। বাছুরটা এক সময় গর্ভবতী হয়। সেই ছোট বকনা বাছুরটির কোলজুড়ে আসে একটি কাজল রঙের বকনা বাছুর। শর্তানুযায়ী হাসতম মন্ডল পালিত বকনার থেকে প্রথম যে বাছুর হবে তার মালিকানা পাবেন। দ্বিতীয় বাছুর পাবেন বকনার মালিক জলিল কারিগর। পালিত বকনার প্রথম বাচ্চা বকনা হওয়ায় হাসমত মন্ডলের কপাল যেন খুলে গেলো। তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। গাভীটির দুধ বিক্রি করে কোন মতে হাসতম মন্ডলের সংসারটা টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে। এভাবেই কাটতে থাকে হাসতম মন্ডলের দিন গরু বাছুর নিয়ে উন্মুক্ত চারণভূমির মাঠে মাঠে। গরুর খড় ভূষি কেনার পয়সা না থাকায় সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার সময় কাটে গরু চরিয়ে। সকাল বিকেল মোড়ের চায়ের দোকানে যেন এক মিনিটও বসার ফুসরৎ তার নেই। নেই অযথা কারো সাথে দু’দন্ড দাড়িয়ে বুকের ভেতরে জমানো না বলা কথা বলবার। হাসমত মন্ডল বলেন, আমি একটি ছোট বকনা বাছুর পোষানী (পালিত) নিয়েছিলাম। সেই বকনা বাছুর থেকে বছর দুয়েক পরে একটি বকনা বাছুর হয়। আমার পাওনা ঐ বকনা বাছুরটি প্রায় তিন বছর পরে একটা বাচ্চার জন্ম দেয়। বকনার প্রথম বাছুরটাও ছিলো বকনা বাছুর। পাওনা ঐ বকনা বাছুরটা আল্লাহর রহমতে আমায় আজ পর্যন্ত ১৯ টা বাছুর দিয়েছে। ঐ একটি পালিত গরু থেকে আজ আমার পালে ১৭ টা গরু রয়েছে। বর্তমানে আমার পালে ৬ টা গাভী রয়েছে। ৬ টা গাভী প্রতি বছর একটা করে বাচ্চার জন্ম দেয়। গাভীগুলো প্রতিদিন ১২-১৪ কেজি দুধ দেয়। প্রতিদিন গড়ে ৬০০-৭০০ টাকার দুধ বিক্রি করে থাকে। বছর শেষে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা গরু বিক্রি করে থাকি। হাসমত মন্ডলের ঘরে পাচ সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ের বিয়েতে ৫ টা গরু দিয়েছেন উপহার হিসেবে মেয়েকে। এর মধ্যে বিঘা তিনেক জমিও বন্ধক রেখেছেন। হাসতম মন্ডল আরও বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই বাবার গরু চরিয়ে আসছি। তখন থেকেই বুঝেছিলাম গাভী গরু পালন করা খুবই লাভজনক। গরুর খাবার কিভাবে যোগান দিয়ে থাকেন জানতে চাইলে হাসমত মন্ডল বলেন, আমি প্রায় সময় গরু মাঠে চরিয়ে থাকি, বাড়ীতে তেমন একটা খাবার দেয় না বললেই চলে। রোদ বৃষ্টি যাই হোক আমি গরু মাঠে চরিয়ে থাকি। কোথাও ঋণ হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ঋণ দেখলে ভয় পায়, আর ঋণ নেওয়ার কোন প্রয়োজনও আমার পড়েনা, যখন টাকার খুব বেশি দরকার হয় তখন পাল থেকে একটি গরু বিক্রি করে সেই বড় ধরনের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকি। সংসারের খরচের জন্য তো গাভী থেকে দুধ বিক্রি করে নগদ টাকা পেয়ে থাকি। আপনার কখনও চায়ের দোকানে বসে বন্ধু বান্ধব প্রতিবেশিদের সাথে গল্প করতে ইচ্ছে হয়না? এমন প্রশ্ন জবাবে কঠোর পরিশ্রমী হাসমত মন্ডল বলেন, আমার সেই সময় কোথায়? খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে গরুগুলোকে পানি দেয়, খাবার দেয়। আর দুধের গাভীর থেকে দুধ দোহন করি। সাথে বেলা বাড়ে। এবারে গোসল খাওয়া শেষে গরু চরাতে মাঠে চলে যায়। বাড়ী ফিরতে ফিরতে রাত নেমে আসে। সব গরু গোয়ালে তুলে আবার পানি দেয়। মশা তাড়াবার জন্য ধোঁয়া দেয়। এরপর হাত মুখ ধুয়ে খেতে খেতে প্রায় রাত অর্ধেক হয়ে যায়। এবার বলুন কাজ ফেলে কখন চায়ের দোকানে মোড়ে বসে গল্প করবো? কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ী গ্রামের উন্মুক্ত গবাদিপশু পালনকারী দিরাজ আলী বলেন, কোন খরচ ছাড়াই আমার পাঁচটা গাভী থেকে দুধ ও গরু বিক্রি করে বছরে প্রায় চার লক্ষ টাকা আয় হয়ে থাকে। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার শুকুর আলী (৮০) বলেন, আমার জীবনে আমি মাঠে মাঠে গরু পালন করা ছাড়া আর কোন কাজ করি নাই। আমি প্রায় ৭০ বছর ধরে গরু পালন করে আসছি। আমার আবাদী জমি বর্গা দিয়ে আমি নিয়োমিত দেশীয় জাতের ৭-৮ টা গাভী গরু পালন করে আসছি। এর থেকে দুধ ও গরু বিক্রি করে বছর শেষে ৩-৪ লক্ষ টাকা আয় করে থাকি। শুকুর আলী বলেন, মাঠে মাঠে গরু চরাতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি এই পেশাকে খুব ভালোবাসি। গরুর রোগবালাই সর্ম্পকে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমাদের গরু রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভেজে তাই আল্লাহর রহমতে কোন রোগবালাই হয়না। ডাক্তার ঔষধ লাগেনা। তাদের বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে উন্মুক্ত চারণভূমি দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে আসাটা। উন্মুক্ত গবাদিপশু পালনকারী দিরাজ আলী বলেন, যদি উন্মুক্ত চারণভূমি থাকে তাহলে দেশীয় জাতের গাভী পালন খুবই লাভজনক। কারন হিসেবে তিন বলেন, দেশীয় জাতের গরুর তেমন কোন রোগবালাই হয়না বললেই চলে। আর বাড়তি কোন খাবারও টাকা খরচ করে কিনতে হয়না। শুধু শ্রমের বিনিময়ে আয় করা যায়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *