কাঙাল হরিনাথ : অনুদার বিরুদ্ধ এক লড়াকু পুরুষ


১৮ এপ্রিল-২০২১ কাঙাল হরিনাথের ১২৫ তম প্রয়াণ দিনের শ্রদ্ধা

গৌতম কুমার রায়

অন্যায়, অনিয়ম, অসমতা সামাজিক ব্যাধির এই সংশ্লিষ্টতা পৃথিবী সৃষ্টির সময় থেকেই। কেউ নিজের জীবনকে উপভোগ করে কেবলমাত্র অনুদার সংশ্লেষ দিয়ে, আবার কেউ তার প্রতিবাদ করেন নীতি ও নৈতিকতাকে দিয়ে। সামর্থ আর সক্ষমতা যাই থাকুক না কেন, মনের সাহস আর বিবেকের উদারতা দিয়ে প্রতিবাদ করা তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। সাংবাদিকতার এক কালের দিব্যজ্যোতি, মহানপুরুষ। যিনি নিজের অনুবিত্তের বিশালতা দিয়ে সমাজ এবং জাতির জন্য উজাড় করে বিলিয়েছেন অকুতোভয়ে। কখনও নিজে হাজির হয়ে, কখনও সংবাদপত্রে, কখনও প্রতিবাদী গান রচনা করে। উপন্যাস কিংবা নাটক, কখনও ধ্যান-জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর বুদ্ধি দিয়ে। তিনি প্রতিবাদকে ছড়িয়ে দিতেন কোন মানুষের অনুভূতিক প্রশান্তি যোগাতে, আবার কোন কোন মানুষের বিবেকের ধারকে ভোতা করে দিতে ঠিক অনুশোচনার জন্য। সমাজে কোন কোন মানুষের জন্ম হয় দেশ এবং জাতির ক্রান্তি কালে দায়বদ্ধতার প্রয়োজনে, অন্যায় আর অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ছিলেন সেই পুরুষ। তিনি মানষিক সঙ্গতিকে সাথে নিয়ে, ক্ষুধা পেটে, ধার-দেনা কওে, জুলুমের বিরুদ্ধে , জালেমের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গেছেন। তিনি ভেবেছেন বয়স্ক এবং নারী শিক্ষা, কৃষক, তাঁতী, শ্রমশীল মানুষের কথা। সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতাকে তিনি ব্যবহার করেছেন নির্যাতনের বিরুদ্ধে খড়গ হিসেবে। অধিকার আদায়ের উপজিব্য হিসেবে। সামাজিক অনুদারকে তিনি সংবাদপত্রের আয়নায় উপস্থাপন করেছেন। যদিও আজকের প্রেক্ষিত ভিন্ন। কোন কোন সংবাদপত্র ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যবসার কারণে,আয়ের খাত হিসেবে। নিজের সম্পদ রক্ষা কিংবা আয়ের উৎস পাহাড়াদার হিসেবে। কাঙালের চিন্তা বা চেতনার ঠিক ভিন্ন পিঠ। তার শিক্ষা বলতে পন্ডিত লোলিত মোহন বিদ্যাতর্কলঙ্কার মহাশয়ের টোল ঘর। এখানেই তা শুরু আবার এখানেই তার শেষ। হরিনাথ সে সময়ের ঘুনেধরা সমাজের শাসন, শোষণ, অনিয়ম, গোঁড়ামী, কুসংস্কার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আঘাত করেছিলেন।দেশের উচ্চবিত্তরা সুবিধা পেতে আর মধ্যবিত্তরা টিকে থাকতে গিয়ে হরিনাথের সংস্পর্শে আসেন নাই। দরিদ্র আর অভাবিরা সকলের সহানুভূতি চায়, তাদেরকে তিনি তা দিতে না পারায় তাদের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন হরিনাথ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন সাঁই, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। তারা একই বিরাহিমপুর পরগণার মানুষ। চিন্তা চেতনায় তিন জন তিন রকমের হলেও তাদের সৃজনশীল চলন এবং মননশীলতা প্রায় কাছাকাছি ছিল। অসাম্প্রদায়িক মনের আলোক ছড়িয়ে মানুষকে পতিত বলয় হতে উদ্ধার করে তাদেরকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা ছিল প্রায় অভিন্ন চিন্তায়। তবে কোন কোন সামর্থ আর সক্ষমতা কবিগুরুর যতটা ছিল তার চেয়ে কমতি ছিল অন্য দুজনের। আবার সাঁইজীর গুরু-শিষ্যের সাংগঠনিক শক্তি ভাল ছিল। কাঙাল আর যাই হোক না কেন, নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকতেন তিনি। লেখনীর প্রতিবাদে সব সময় প্রতিবাদী ছিলেন হরিনাথ। পত্রিকা সম্পাদন করা আর সাহিত্য সাধনা করা। এই কাজের মধ্যে কাঙাল হরিনাথ প্রগতির পথে এগিয়ে মানুষের জন্য কাজ করতেন। তিনি জানতেন গ্রামের মানুষ হত দরিদ্র। তারা সুবিধা এবং অধিকার বঞ্চিত। গ্রামের উৎপাদনশীল যে মানুষগুলো সারাদিন কাজ করতেন তাদের উপরে জমিদার এবং ইংরেজ সাহেবদের ভালবাসার কোন স্পর্শ ছিল না কখনও। তারা কৃষকদেরকে বঞ্চিত করে পরিতৃপ্তি পেত। এই অনাচার আর অবিচারের প্রতিবাদের স্বরূপ প্রতিকৃতি ছিলেন হরিনাথ। সবচেয়ে অদ্ভূত এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো কাঙাল তার উপস্থাপনে সবসময় গ্রামের স্বার্থ দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। শহরের বিলাসি জীবনকে ব্যবহার করেন নাই। তিনি জীবনে উনিশ শতকে যে নবজাগরণের সূচনা করেছিলেন, সেখানে নিজেকে মূলধারার সাথে যুক্ত রেখেছিলেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই তিনি বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলা শহরে পিতা হলধর মজুমদার এবং মাতা কমলিনী দেবীর ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। তবে জন্মের পর তিনি পিতা মাতা হারা হয়ে এক অনিশ্চিত ও দারিদ্র পিড়িত জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। আর নিজেকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন ক্ষুধা আর অভাবের যন্ত্রণার সবটুকুই। তিনি অন্যের অধিকার সংরক্ষণে ছিলেন প্রতিবাদী। তিনি নিজে লেখাপড়া তেমন না শিখলেও পাড়ার শিশু আর মেয়ে এবং বয়স্কদের পড়াশোনার প্রতি ছিলেন আইকোন সরূপ। নৈশ বিদ্যালয়, বয়স্ক বিদ্যালয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় আয়োজনে সমাজকে সৃজন করে গেছে সেই অনন্তকালের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। তিনি নিজে স্বপ্ন না দেখলেও অন্যকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং তা বাস্তবায়নে সহায়তা করে গেছেন। একটা জায়গায় মানুষ কাঙাল, রবীন্দ্রনাথ এবং সাঁইজী অভিন্ন অবস্থানের জন্য মাথা অবনত করে শ্রদ্ধা জানাতে বাধ্য, তা হলো তাদের অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনা। যা কালকে কালান্তর শ্রদ্ধার্ঘ্য স্মরণে। মহামতি এই কালপুরুষের দিব্যজ্যোতি অস্তমিত হয়েছিল ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল।
১৮৮০ সালে কাঙাল গানে গানে মানুষের ভাব এবং উপলদ্ধির বিষয় সমুহকে সহজ হৃদয়ঙ্গম করতে প্রতিবাদের সুর ও ছন্দকে মনে মনে মিশিয়ে দিতে গঠন করেন ফিকির চাঁদের বাউলের দল। এই দলে মা-মাটি-মানুষের প্রাণের মাহিত কথা আর সুর স্পর্শ করলো ধোপা, কামার-কুমার. মিস্ত্রি, শ্রমিক, মজুর, নাপিত, মুটে,দোকানদার সকল নি¤œভূক মানুষ হতে বিত্তবান মানুষের হৃদয়ে। কাঙাল এই বাউলদলে এসে নিজে এবং অন্যদেরকে সাধন-ভজনে টেনে এনেছেন। যে জন্য এ সময়ে ক্লান্ত মানুষ এবং গোধুলীলয়ে রাখালের কন্ঠে শোনা যেত
“ হরি দিন ত গেল সন্ধ্যা হল পার কর আমারে,
তুমি পারের কর্তা, শুনে বার্ত্তা,ডাকছি হে তোমারে।”
আবার
তিনি জীবন উপলদ্ধিকে প্রাসঙ্গিক চিন্তায় মানুষের সামনে হাজির করেছেন কথা আর সুর জড়িয়ে। নিয়তির যে বাস্তব ভাবনা, তাকে তিনি জড়িয়েছেন,

“ আগেও উলঙ্গ দেখ, শেষেও উলঙ্গ।
মধ্যে দিন দুই কাল বস্ত্রের প্রসঙ্গ॥
মরণের দিন দেখ সব ফক্কিকার।
তবে কেন মূঢ় মন কর অহংকার॥
কাঙাল সর্বপরি এক অদৃষ্টবাদী মানুষ এবং আস্তিক পুরুষ ছিলেন। তার সৃষ্টিত প্রামাণ্য গান, কবিতা,গল্প, পদ্য সব সময় ঐশ্বরিক সম্বন্ধীয়। তার গানের দল ফিকির চাঁদের দলকে দিয়ে তিনি মানুষের মানস বাসনার রন্ধ্রে সুখ এবং সন্মানের খোরাক যুগিয়ে দিতেন। একবার এই উপমহাদেশ হতে চাকুরী চুকিয়ে সু-শাসক লর্ড রিপন স্বস্ত্রীক যখন বিদায় নিচ্ছেন, তখন এই ফিকির চাঁদের দল ‘জয় রিপনের জয়’ গানের সুরের মাতাল তরঙ্গ সৃষ্টি করে তাদেরকে কুমারখালী হতে পোড়াদহ রেল স্টেশন পর্যন্ত পৌছে দিয়েছিলেন।
হরিনাথের সাংবাদিকতার সংযোগটা ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ বা বাংলা ১২৭০ সালেরও আগে ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতে গিয়ে। এই সালে তিনি ¯্রফে হাতে লিখে ‘দ্বি-মাসিক গ্রামবার্তা’ পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। পরে তা মাসিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায় রূপান্তরীত হয়। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কাঙাল কুঠিরে স্থাপিত হলো ঐতিহাসিক এম এন প্রেস। এই প্রেসটি মখুরানাথ বাবু তার খুড়ো নবীন চন্দ্র সাহার দানের ৬০০/= টাকায় কেনেন। গ্রামবার্তা পত্রিকায় কালি ও কলমের বিষ্ময়কর বোমা বিস্ফোরিত হতো। বিশেষ করে অত্যাচারী জমিদার এবং কৃষক শত্রু নীলকর ইংরেজদের কু কর্ম। একবার এই গ্রামবার্তায় “গরুচোর ম্যাজিস্ট্রেট”শিরোনামে একটা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। জানা গেল, পাবনার ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার হামফ্রি সাহেব গ্রাম পরিদর্শনে এসে, এক গরীব বিধবার দুগ্ধবতী গাভী দেখে লোভ সামলাতে না পেরে ছলে-বলে কৌশলে তা হস্তগত করলে, এই সংবাদের জন্ম হয়। মিঃ হামফ্রি এতে দারুণ ক্রুদ্ধ হয়ে, কাঙালকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এতে কাঙাল হরিনাথ বিন্দুমাত্র ভয়- বিচলিত না হলে, হামফ্রি পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক হরিনাথের দারুন প্রশংসা করে বলেছিলেন, “মি. সাংবাদিক আমি আপনাকে ভয় না পেলেও, আপনার কলম কে ভয় পাই। যে জন্য আমি অনেক কু-কর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি।”
আমাদের সমাজে কথা প্রচলনে বলে, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন তারা সব সময় বিপদের ঝুঁকিতে থাকেন। কিংবা উপকৃত মানুষ কখনও উপকারকারীর বিপদে পাশে থাকে না। যতদিন গ্রামবার্তা ছিল ততদিন নীলকর আর জমিদারদের শত্রু ছিলেন হরিনাথ। অথচ পল্লীবাসীর উপকার করতে গিয়ে কাঙাল হরিনাথ যখনই বিপদের সন্মুখীন হয়েছেন, তখনই এরা ছিলেন দারুন উদাসীন এবং নিস্পৃহ। যে জন্য কাঙাল হরিনাথ তার কথায় বলেছেন, “ জমিদারেরা যখন আমার প্রতি অত্যাচার করে এবং আমার নামে মিথ্যা মোকদ্দমা উপস্থিত করতে যতœ করে, আমি তখন সকল গ্রামবাসীকে ডাকিয়া আনি এবং আত্মাবস্থা হানাই। গ্রামের একটি কুকুর কোন প্রকারে অত্যাচারিত হইলেও গ্রামের লোকে তাহার জন্য কিছু করেন। কিন্তু উপকৃত পল্লীবাসী হরিনাথের বিপদ ও সংকটে কিছু করিবেন, এরূপ একটি কথাও বলিলেন না। যাহাদের নিমিত্ত করিলাম, বিবাদ মাথায় করিয়া বহন করিলাম, তাহাদিগের এই ব্যবহার।”
ইতিহাস কখনও বেচারাম নয়, যে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। যুগের ধারায় এখনও আমাদের সমাজ বদলে গেছে। প্রেক্ষিত পাল্টে গেছে। আগে যে ইংরেজ ও জমিদার অত্যাচার করেছে, এখনও তা আছে এবং তা আরো ভয়াবহ বর্ণনায় আছে। সেকালে এক সাংবাদিক প্রতিবাদ করে গেছেন। এখন সংঘবদ্ধভাবে অপ-সাংবাদিকেরা অবাধ্য হয়েছে। প্রকৃত সাংবাদিকেরা এদের কাছে নিরূপায়। স্বাধীন দেশে সুফলভোগী তারাই যারা দুঃসহ-দূর্বৃত্ত মানুষেরা যারা শিক্ষিতের দাবিদার। অথচ এখন কিছু বাদে কিছু কিছু সাংবাদিকেরাও ঠিক উল্টো। ভূঁইফোড় সংবাদপত্রে উঁইফোড় সাংবাদিকেরা প্রকৃতদেরকে মাথা হেট খাইয়ে ছাড়ছে। সময়ের বাতাবরণে কাঙাল আমাদের জন্য যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি নাই। তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে আমরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি নাই বলে আমরা এ ক্ষেত্রে পথচ্যুত।
—– লেখক: গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *